শাহজাদ ভাট্টি। পাকিস্তানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও আন্ত সীমান্ত অপরাধ চক্রের এই প্রধান অনলাইনে ‘৩৩৩’ নামেও বেশ পরিচিত।
এ বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগে ভাট্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এ অভিযান চালানো হয়েছে।
অনলাইনে ‘সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য’
প্রথম দেখায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাট্টির উপস্থিতি গ্যাংস্টার বা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারীর প্রচারমাধ্যম বলে মনে হয় না। সেখানে জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গান ও বলিউডের সিনেমার সংলাপের সঙ্গে তৈরি ঝকঝকে ভিডিও, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ক্লিপ এবং ভারতে জনপ্রিয় বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়।
তার অনলাইন নেটওয়ার্ক খুব বেশি পেশাদারও নয়। বরং তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর এর বড় অংশ নির্ভরশীল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লক্ষ্য হিসেবে বিশেষ করে এমন ভারতীয় তরুণদের বেছে নেওয়া হচ্ছে, যারা দরিদ্র এবং একই সঙ্গে দ্রুত অর্থ ও পরিচিতি পাওয়ার আশায় অপরাধজগতে প্রবেশ করতেও দ্বিধা করে না।
এনডিটিভির ডেটাফাইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউবজুড়ে ভাট্টির বিস্তৃত অনলাইন নেটওয়ার্ক রয়েছে।
এ ছাড়া ‘৩৩৩’ বা ‘সফটওয়্যার আপডেট’ শব্দ ব্যবহার করা আরও কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাকিস্তানে অবস্থানকারী তরুণ ভিডিও এডিটররা ভাট্টির পুরোনো ভিডিও নতুনভাবে সম্পাদনা করে এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় ভারত সরকার ‘৩৩৩’ যুক্ত বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলেও নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাচ্ছেন ভাট্টি। একই সঙ্গে অনুসারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে অনলাইন উপস্থিতি ধরে রাখছেন তিনি। এসব তরুণ ভিডিও এডিটরের সঙ্গে নিয়মিত গ্রুপ ভিডিও কলও করেন ভাট্টি।
এক ভিডিও বার্তায় তিনি তার ‘এডিটর ভাইদের’ ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা তার ভিডিও ডাউনলোড, সম্পাদনা ও পুনরায় পোস্ট করছেন এবং তাকে বড় ভাই হিসেবে বিবেচনা করছেন।
‘রবিনহুড’ ভাবমূর্তি
ভাট্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসবহুল গাড়ির বহর, অস্ত্র প্রদর্শন, বাঘ-সিংহের সঙ্গে ভিডিও, বিদেশ ভ্রমণ এবং জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গান ও চলচ্চিত্রের সংলাপ ব্যবহার করে তৈরি ভিডিও দেখা যায়। এসবের মাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘রবিন হুড’ ধাঁচের একজন প্রভাবশালী ও দরিদ্রবান্ধব গ্যাংস্টার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ করে ভারতের সুবিধাবঞ্চিত ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের লক্ষ্য করে এই অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভাট্টির বিলাসবহুল ও মাফিয়া-ধাঁচের জীবনযাপনকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।
ভিনদেশী রাজনৈতিক প্রভাব
বিদেশে অবস্থান করেও তিনি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের ওপরও নজর রাখেন। সুযোগ পেলেই বিভাজনমূলক বক্তব্য ছড়ানোর চেষ্টা করেন।
চলতি মাসের শুরুতে পাঞ্জাবের গুরদাসপুরে রণজিৎ সিং নামের এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় ভিডিও পোস্ট করেন ভাট্টি। তিনি ঘটনাটিকে ‘ভুয়া এনকাউন্টার’ বলে দাবি করেন এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ওই তরুণকে টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
এছাড়াও ভারতীয় মুসলিম তরুণদের আকৃষ্ট করতে ভাট্টি প্রায়ই ইসলামবিরোধী কথা বলা বা মুসলিমদের ক্ষতি করতে চায়—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
গ্রেপ্তারের পর নতুন বার্তা
১২ আগস্ট ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর ভাট্টি নতুন একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খোলেন। প্রথম ভিডিওতেই ভারতে থাকা অনুসারীদের সতর্ক করে তিনি ওই অ্যাকাউন্ট অনুসরণ না করতে, পোস্টে লাইক বা মন্তব্য না করতে বলেন, যাতে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাদের শনাক্ত করতে না পারে।
তিনি বলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে সরাসরি বার্তা পাঠাতে হবে।
তরুণদের অপরাধে টানার অভিযোগ
ভাট্টির কথিত মাফিয়া-ধাঁচের জীবনযাপন ভারতের এক শ্রেণির তরুণকে আকৃষ্ট করছে বলে এনডিটিভির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তাদের কেউ কেউ তার নির্দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর ইঙ্গিতও প্রকাশ্যে দিয়েছে।
পাঞ্জাবের গ্রামীণ এলাকার এক তরুণ ভাট্টির একটি ভিডিওতে মন্তব্য করে তাকে আশ্বস্ত করে যে, ভাট্টি চাইলে সে তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং কার বাড়িতে বোমা হামলা করতে হবে, সেই ব্যক্তির নামও নিতে পারবে।
পাঞ্জাবের আরেক তরুণ আরমান দীপ। তিনি অমৃতসরভিত্তিক একটি নিরাপত্তা সংস্থার পোশাক পরা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ভাট্টির একটি ভিডিওতে মন্তব্য করে তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
ভাট্টির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক অপরাধমূলক মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে শাহজাদ ভাট্টির বিরুদ্ধে। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকির হত্যাকারীকে ভারত থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া গত বছর পাঞ্জাবের গুরদাসপুরে একটি থানায় গ্রেনেড হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় সাত বছর আগে তিনি বিদেশে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে দুবাই থেকে নিজের অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন ভাট্টি।


