শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউ ইয়র্ক: অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের খবর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক বুধবার বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের খবর—বিশেষ করে ই১ এলাকায় নতুন আবাসন প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান—নিয়ে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইসরায়েলি সরকার চলতি সপ্তাহে ই১ এলাকায় ১,২০০টির বেশি নতুন আবাসিক ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
জাতিসংঘের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের মধ্যকার ভৌগোলিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরকে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে কার্যত বিভক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক অখণ্ডতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
জাতিসংঘ মহাসচিব ইসরায়েলকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) পরামর্শমূলক মতামতের কথাও উল্লেখ করেন। ওই মতামতে অধিকৃত গাজা ও পশ্চিম তীর, যার মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমও রয়েছে, ইসরায়েলের দখলকে “অবৈধ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি
এদিকে পশ্চিম তীরের হেবরন এলাকার দাহিরিয়ায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে, কার্যত নিজ নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা অংশীদারদের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে কারফিউ জারি করেছে, ভবনের ছাদে স্নাইপার মোতায়েন করেছে, মাটির বাঁধ দিয়ে সড়ক বন্ধ করেছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্তত সাতটি ফিলিস্তিনি বাড়ি জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেন, এর তাৎক্ষণিক মানবিক প্রভাব পড়ছে। মানুষ খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না, জরুরি সেবা নিতে পারছে না এবং কর্মস্থলেও যেতে পারছে না। তিনি বলেন, বাড়িঘর ও পরিবারগুলোকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে। যেকোনো নিরাপত্তা অভিযান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া উচিত এবং এতে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
গাজায়ও অব্যাহত ইসরায়েলি হামলা
২০২৫ সালের অক্টোবরের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই প্রাণঘাতী হামলা, গুলিবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও বিমান হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত অংশীদার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল যে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত সিমেন্টের ব্লক স্থাপন করেছে, তার পশ্চিম দিকের এলাকাগুলোতেও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।স্থানীয় প্রাথমিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জাতিসংঘ জানিয়েছে, মঙ্গলবার গাজার একটি সমুদ্রবন্দরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। বুধবারও সেখানে নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র দুজারিক বলেন, এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং তাদের নিরাপদ স্থানে যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া ও মানবিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করছে।
‘মানবতার সীমা অতিক্রম করেছে’
ফিলিস্তিনিদের নিয়ে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) বলেছে, বেন-গভিরের বক্তব্য “নৃশংস অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এমন সহিংসতায় উসকানি” দেওয়ার শামিল। দপ্তরটি বলেছে, ইসরায়েলি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মানবতার মৌলিক নীতির প্রতি চরম অবজ্ঞার আরেকটি উদাহরণ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর মন্তব্য করেছে, “এটি মানবতার সীমা অতিক্রম করেছে।”
OHCHR-এর মতে, এ ধরনের “অমানবিক বক্তব্য” এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জাতিসংঘ জানিয়েছে, ওই সময় থেকে গাজায় ৭৩,৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৭৪,৩১২ জন আহত হয়েছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ১,১২৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানির নিন্দা জানাতে ইসরায়েলকে আহ্বান
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর মনে করিয়ে দিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা জারি করেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার প্রেক্ষাপটে আদালত ইসরায়েলকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সরাসরি ও প্রকাশ্য উসকানি প্রতিরোধ এবং শাস্তি দেওয়ার জন্য তার ক্ষমতার মধ্যে থাকা সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
OHCHR বলেছে, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের অব্যাহত হামলা ও ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও ইসরায়েলি সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বেআইনি ব্যাপক হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত ও ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ইসরায়েল সরকারকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানির ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে নিন্দা এবং তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।


