শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউইয়র্ক: গাজার ২১ লাখ বাসিন্দার প্রায় ৯৪ শতাংশেরই এখন জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়ের প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি গুলিবর্ষণ ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননেও ইসরায়েলি বিমান হামলা, স্থাপনা ধ্বংস এবং চলাচলে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ও অংশীদারদের তথ্য অনুযায়ী, গাজার পাঁচটির মধ্যে চারটির বেশি পরিবার বর্তমানে সংকটপূর্ণ বা বিপর্যয়কর জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীর তীব্র ঘাটতির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, এসব সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের ঘুমানো, রান্না করা, গোসল করা, খাবার ও পানি সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাঁবুতে বসবাস করছে দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার তাঁবু অথবা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। এসব তাঁবু দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য তৈরি নয় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। গত শীত মৌসুমে গাজার ৭০ শতাংশের বেশি পরিবার বন্যার শিকার হয়েছিল। আসন্ন শীত ও বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো পরিবারগুলোর জন্য আরও টেকসই আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে।

তবে গাজায় নির্মাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ এবং অর্থের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের অংশীদারদের হিসাব অনুযায়ী, গাজার মানুষের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি উন্নত করতে প্রায় ৫৬২ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ৫০ মরদেহের দাফন

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণে বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার খবরও অব্যাহত রয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। বৃহস্পতিবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা ৫০ জনের মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন শিশু। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এসব মানুষ দুই বছরেরও বেশি সময় আগে নিহত হয়েছিলেন।

তবে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহ উদ্ধারের কাজও নানা বিধিনিষেধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারী যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, লুব্রিকেন্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ছাড়া গাজার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবেশাধিকারও সীমিত। জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেন, বেসামরিক মানুষকে কখনোই লক্ষ্যবস্তু করা বা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।

ইঁদুর ও রোগবালাই মোকাবিলায় অভিযান

ধ্বংসস্তূপ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে গাজায় ইঁদুরসহ বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির উদ্যোগে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গত মে মাস থেকে এই কার্যক্রমের আওতায় ৩ হাজার ২৫০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল, বাজার ও হাসপাতাল।

লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা

এদিকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী বাহিনী—ইউনিফিল। সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত ইউনিফিল ৮৬টি আকাশসীমা লঙ্ঘন, নয়টি বিমান হামলা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ছোড়া ২৬৫টি প্রজেক্টাইল পর্যবেক্ষণ করেছে। এ ছাড়া ড্রোনের প্রায় ৩০টি কর্মকাণ্ডও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নজরদারি, হামলা এবং আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার ছিল।

ইসরায়েলি বাহিনীর মাধ্যমে অবকাঠামো ধ্বংস এবং বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিফিল। এ ছাড়া চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে চলতি সপ্তাহে সাতটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় জাতিসংঘের টহল, বহর ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে, পথ পরিবর্তন করতে হয়েছে অথবা ফিরে যেতে হয়েছে।

গাজা ও লেবাননে জাতিসংঘের সহায়তা

সংকটের মধ্যেও গাজা ও লেবাননে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা তাদের মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গাজায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ একটি নতুন অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র চালু করছে। ইউনিসেফ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে জরুরি সহায়তা দিচ্ছে এবং পশ্চিম তীরে শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি গাজায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কাছে খাদ্যপ্যাকেট, গমের আটা, রুটি, রান্না করা খাবার, শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, পুষ্টি সহায়তা এবং নগদ সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।

গাজায় ধ্বংসস্তূপ অপসারণ ও পুনর্ব্যবহার নিয়ে নতুন নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে ইউএনডিপি। এর লক্ষ্য হলো রাস্তা পুনরায় চালু করা, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির জন্য জায়গা প্রস্তুত করা এবং হাসপাতাল ও মানবিক সহায়তা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা। জাতিসংঘ বলছে, গাজায় মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি আসন্ন শীত মৌসুমে আশ্রয়, জ্বালানি ও মৌলিক প্রয়োজনীয়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।