শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়া এখনো বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে বিদেশে পাঠাচ্ছে। এসব শ্রমিকের একটি অংশ রাশিয়ার মাটিতে সামরিক ড্রোনসহ প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদনে কাজ করছে বলে জানিয়েছে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)। বুধবার প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT) জানিয়েছে, বর্তমানে আনুমানিক ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২৮০ জন উত্তর কোরীয় শ্রমিক বিদেশে অবস্থান করছেন। তাদের প্রায় সবাই চীন ও রাশিয়ায় কর্মরত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন থেকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)-এর দাবি, এই অর্থ উত্তর কোরিয়ার অবৈধ পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চীন ও রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি শ্রমিক
মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)-এর হিসাবে, চীনে বর্তমানে ২০ হাজার থেকে ৭০ হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিক কাজ করছেন। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার শ্রমিক সাময়িকভাবে উত্তর কোরিয়ায় ফেরত গেলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চীনে নতুন করে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক প্রবেশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়াতেও উত্তর কোরীয় শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিক ছিলেন বলে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT) অনুমান করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ায় অবস্থানরত কিছু উত্তর কোরীয় শ্রমিক সামরিক ড্রোন তৈরিসহ প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। রাশিয়ার মাটিতে অবস্থিত ড্রোন কারখানাতেও উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের কাজ করার তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের রাশিয়ায় শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানোর জন্য একটি স্টুডেন্ট ভিসা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT) মনে করে।
আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ে নেয় উত্তর কোরিয়া
মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)-এর দাবি, বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের উপার্জনের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উত্তর কোরীয় কর্তৃপক্ষ নিয়ে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যে অর্থ নিয়ে নেয়, তা শ্রমিকের প্রকৃত উপার্জনের চেয়েও বেশি হয়ে যায় এবং এতে শ্রমিকরা উত্তর কোরিয়ার কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিকদের চলাফেরা ও বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপরও উত্তর কোরীয় কর্তৃপক্ষ কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। কোনো শ্রমিক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে উত্তর কোরিয়ায় থাকা তার পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়ায় কর্মরত একজন উত্তর কোরীয় শ্রমিক বছরে গড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ডলার আয় করেন বলে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)-এর হিসাব। শিল্পভেদে রাশিয়ায় উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের মাসিক আয় চীনে কর্মরত শ্রমিকদের তুলনায় সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন বাধ্যবাধকতা
২০১৭ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরীয় নাগরিকদের বিদেশে আয় করার সুযোগ বন্ধে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিদেশে আয় করা উত্তর কোরীয় নাগরিকদের ২০১৯ সালের মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানোর বাধ্যবাধকতাও ছিল। তবে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT) বলছে, সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অন্তত ১৭টি দেশ এখনো উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের অবস্থানের অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান
উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে থাকা নিরাপত্তা পরিষদের ১৭১৮ কমিটির বিশেষজ্ঞ প্যানেল ২০২৪ সালের এপ্রিলে বিলুপ্ত হয়। ২০২৪ সালের মার্চে প্যানেলের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটোর পর সেটি আর কার্যকর থাকেনি। মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT) জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞ প্যানেল বিলুপ্ত হওয়ার পর যে পর্যবেক্ষণ-ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তাদের নতুন প্রতিবেদন সেই ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করতে সহায়তা করবে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আগের মতো একই শক্তি ও কাঠামোতে বিশেষজ্ঞ প্যানেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (MSMT)। সংস্থাটি বলেছে, উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা প্রকাশ করা অব্যাহত রাখবে তারা।


