সকল বিভ্রান্তি ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। ব্রাজিলের পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছেছেন।

টিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বুধবার সকালে বলসোনোরো স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে ফ্লোরিডার মিয়ামির ওপা-লোকা বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামছেন। পরবর্তীতে ওই পরিবারকে ছাতার নিচে মুখ লুকিয়ে বিমানবন্দর ত্যাগ করতে দেখা যায়।

 

রবিবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যান ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ফ্লাভিও বলসোনারো। সোমবার ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস ফ্লাভিও বলসোনারোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় বলসোনারো পাসপোর্ট জমা না দিয়ে মঙ্গলবার রাতেই তাঁর পরিবারসহ গোপনে সীমান্ত পার হয়ে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিল হয়ে মিয়ামির উদ্দেশ্যে ফ্লাইটে চড়েন। বুধবার তারা মিয়ামি পৌঁছান।

 

বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ একটি ব্রাজিলীয় সূত্র জানিয়েছে যে, এই রাজনীতিবিদ ব্রাজিলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলসোনারোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমোদন দিয়েছেন। ওই উপদেষ্টা আরো জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সোমবারই জানতে পেরেছিলেন যে বলসোনারোর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় আছে। এরপর তাঁরা পরাজিত এই ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

 

দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এর আগে সিএনএনকে বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলসোনারো এবং তাঁর পরিবারকে ভিসা দিচ্ছে। রাতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি বলসোনারোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার ব্যাপারে সম্মতি দেবেন।

ট্রাম্প বলেন, ’হ্যাঁ, আমি অনুমোদন দেব। আমি মনে করি ওরা ভালো মানুষ। নির্বাচনটি খুব অদ্ভুত ছিল এবং আমার মনে হয়েছে এটি ভয়াবহ ছিল।’

 

সিএনএন-এর সহযোগী গণমাধ্যম সিএনএন ব্রাজিল জানিয়েছে, বলসোনারো তাঁর পাসপোর্ট সমর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করে দিয়েছে। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ইনফোবে যখন প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে ট্রাম্পপন্থী প্রার্থী বলসোনারো আর্জেন্টিনার রুট ব্যবহার করে ব্রাজিল ত্যাগ করেছেন, তখন থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়তে থাকে।

আর্জেন্টিনা সরকার প্রথমে এক বিবৃতিতে বলেছিল যে তাদের কাছে ’ফ্লাভিও বলসোনারোর দেশে প্রবেশের কোনো রেকর্ড নেই।’ কিন্তু বুধবার ভোরের দিকে আর্জেন্টিনার অভিবাসন মন্ত্রণালয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ একটি পোস্টে জানায় যে, বলসোনারো এবং তাঁর পরিবার মঙ্গলবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁদের ফ্লাইট প্ল্যান অনুযায়ী তাঁরা ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশ্যে একটি ফ্লাইটে চড়েন। মন্ত্রণালয় আরো যোগ করে যে, তাঁরা ’বৈধ নথিপত্র’ সহকারে এবং কোনো আইনি বাধা ছাড়াই আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেছিলেন। 

একাধিক অভিযোগের তদন্ত হলেও ব্রাজিল ছাড়ার সময় বলসোনারোর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, পাসপোর্ট জমা দেওয়ার আদালতের নির্দেশ অমান্য করার এই কাজটিই তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারে।

ফ্লাভিও-র এই যাত্রা ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর পদক্ষেপেরই প্রতিফলন। পরাজয়ের পরপরই জাইর বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে চলে যান এবং সেখানে তিন মাস অবস্থান করেন। সেই সময়ে তাঁর শত শত সমর্থক রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে তাণ্ডব চালায় এবং সুপ্রিম কোর্ট, কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ভাঙচুর করে। ২০২২ সালের নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টার কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা মঙ্গলবার সমর্থকদের এক সমাবেশে বলেন যে, বলসোনারোর ব্রাজিল থেকে পালিয়ে যাওয়া লজ্জাজনক এবং আদালতে নিজের অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাঁর দেশেই থাকা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ’দুর্ভাগ্যবশত, এটাই বলসোনারো পরিবার। ব্রাজিল তাদের দ্বিতীয় জন্মভূমি। তাদের প্রথম জন্মভূমি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।’

বলসোনারো প্রথমে লুলার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন যে তাঁর দল ফলাফল বাতিলের দাবি জানাবে। তবে বলসোনারোর লিবারেল পার্টি পরে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। সিএনএন ব্রাজিল অনুসারে, দলের প্রধান ভালদেমার কোস্তা নেতো বলেছেন, ’আমরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিচ্ছি। তবে আমরা মনে করি যে উত্থাপিত বিষয়গুলো সঠিকভাবে স্পষ্ট করা দরকার।’

পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর এভাবে দেশত্যাগ তাঁর নিজের দলকেও আকস্মিক ধাক্কা দিয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর ক্যাম্পেন ম্যানেজার। রজেরিও মারিনহো সাংবাদিকদের বলেন, ’আমরা বিস্মিত, কারণ গতকালই আমরা আলোচনা করেছিলাম যে ফ্লাভিও যে প্রায় ৬ কোটি ভোট পেয়েছেন; তা বিবেচনা করে বিরোধীদের এই নেতৃত্বের ভূমিকা তাঁরই নেওয়া উচিত।’ সূত্র: সিএনএন