অনুন্নত বা তৃতীয় বিশ্বের দেশে নির্বাচনের আগে ভোট কেনা-বেচা বা ভোটারদের লোভ দেখাতে সম্ভব-অসম্ভব নানা অঙ্গীকার করে প্রার্থীরা। কিন্তু উন্নত বিশ্বে ব্যাপারগুলো অন্যরকম।

নিয়মের বাইরে কিছু করা মুশকিল। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার প্রমাণ করেছেন, প্রচলিত রীতি-নীতি তার জন্য নয়। নিয়ম ভাঙতেই তার আনন্দ। 

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী সামনে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে রিপাবলিকানদের একটি কনভেনশনে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছিলেন।

ভোটারদের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব দেওয়ার মাধ্যমে- রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাখুন এবং প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান ৫ হাজার ডলার পাবেন—এই প্রস্তাব নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের কোনো হেলদোল নেই। বরং বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে ভোটারদের প্রলুব্ধ করার জন্য নানান অঙ্গীকার করেন তিনি, যা আসলে করা সংগত নয়।

 

প্রকৃতপক্ষে, গুরুত্বপূর্ণ সিনেট লড়াই চলা রাজ্যগুলোর প্রায় অর্ধেকটিতেই ট্রাম্প ভোটারদের নির্দিষ্ট কিছু জিনিস দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন, যদি তারা রিপাবলিকানদের ভোট দেন।

বেশি সমালোচনা হলে, তিনি বা তার লোকজন বলেন, এটা কৌতুক করে বলা। কিন্তু দিন দিন এগুলো আর কৌতুক থাকছে না। এমনকি ট্রাম্পের অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড বিবেচনা করলে এই তথাকথিত কৌতুকগুলোকে উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন। 

 

রাজনীতিবিদরা নির্বাচনে জিতলে এবং কংগ্রেসে ক্ষমতা পেলে কোন কোন অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন, তা ভোটারদের জানানো স্বাভাবিক বিষয় হলেও, এর মধ্যে অনেক প্রতিশ্রুতিই ট্রাম্প চাইলে এখনই পূরণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে একটি লক্ষণীয় লেনদেনমূলক উপায়ে এগুলোকে ভোটারদের মাথার ওপর ঝুলিয়ে রাখছেন।

ভোট দিলে এগুলো করা হবে, নইলে নয়। অথচ অঙ্গীকারের অনেকগুলো বেশ স্পর্শকাতর।

 

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় ট্রাম্পের কিছু বিনিময়মূলক অঙ্গীকার হলো :

১৬ সেপ্টেম্বর : নর্থ ক্যারোলিনার গ্যাস্টোনিয়াতে ট্রাম্প বলেন যে, তিনি রাজ্যের হারিকেন দুর্যোগ ত্রাণ সহায়তার বিষয়টি ভোটারদের দ্বারা রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে সিনেটে নির্বাচিত করার সাথে জুড়ে দেবেন। তিনি বলেন, ‘এখন, মাইকেল যদি হেরে যায়, আমি তা পাঠাচ্ছি না। ঠিক আছে?’ তবে এই দাবি করার পরপরই ট্রাম্প বলেন যে, তিনি কেবলই কৌতুক করছেন।

তবে তিনি কৌতুক করলেও, ট্রাম্প প্রশাসন রিপাবলিকান সমর্থিত রাজ্যগুলোতে দুর্যোগ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই বেশি উদার ও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তারা সম্প্রতি আদালতে স্বীকার করেছে যে তারা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণরূপে অনুদান গ্রহণকারী রাজ্যের রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়েছিল।

৩ অক্টোবর : ওহাইওর ভ্যান্ডালিয়াতে ট্রাম্প বলেন, ’আপনি যখন প্রেসিডেন্ট হবেন, তখন রাজ্যগুলোর ওপর আপনার অনেক ক্ষমতা থাকে।’ তিনি বলেন যে, ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটররা তাদের রাজ্যের জন্য অর্থ বরাদ্দ পেতে ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ব্যবহার করতে পারেন, তবে ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর পদপ্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টন সম্পর্কে তিনি যোগ করেন, ‘আমি সম্ভবত তাকে সাহায্য করব না। আমার মনে হয় সে আমাকে ঘৃণা করে।’

১৭ অক্টোবর : কেনটাকির হাইল্যান্ড হাইটসে ট্রাম্প বলেন, ’রিপাবলিকানরা জিতলে, ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার কেনটাকির উইনচেস্টারে একটি বিশাল ওষুধ উৎপাদন কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ’কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা জিতলে তা হবে না, কারণ তারা এটি করতে পারবে না।’

১৯ এবং ২২ অক্টোবর : কানসাসের পার্ক সিটি এবং আইওয়ার সিউক্স সিটি উভয় জায়গার সমাবেশে ট্রাম্প বলেন যে, রিপাবলিকানরা জিতলে তিনি ই-১৫ জ্বালানি স্থায়ীভাবে সারা বছর জুড়ে সহজলভ্য করবেন। আগের উপস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন, ’রজার মার্শাল (কানসাসের রিপাবলিকান সিনেটর) সিনেটে থাকলে আমরা সারা বছরব্যাপী ই-১৫ স্থায়ী করব।’ এবং পরে আরো বাড়িয়ে বলেন, ‘কিন্তু যদি অ্যাডাম হ্যামিল্টন (ডেমোক্র্যাট প্রার্থী) জেতেন, আমি তা করছি না। ব্যাস এটুকুই। আমি এটা কেবল মার্শালের জন্যই করছি।’

২০ অক্টোবর : নর্থ ক্যারোলিনার গ্রিনভিলে ট্রাম্প বলেন যে, ‘আমরা যদি হাউস এবং সিনেটে জিতি, তবে আমি বিচার বিভাগকে ক্যাম্প লেজুনে পানি দূষণ সংক্রান্ত সমস্ত অবশিষ্ট বৈধ দাবিগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘সুতরাং, আমরা যদি না জিতি, কোনো টাকা নেই। আমরা যদি জিতি, আপনারা তা পাচ্ছেন।’

২৪ অক্টোবর : জর্জিয়ার পেরিতে ট্রাম্প বলেন যে, কৃষকদের জন্য সাহায্য এবং অন্যান্য অনুগ্রহের খোঁজ করা ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফের কোনো কল তিনি গ্রহণ করবেন না। ট্রাম্প একটি কাল্পনিক কথোপকথনের অবতারণা করে বলেন, ’তাকে বলে দাও আমি নেই। আমি নেই।’ কাল্পনিক, অন্য ব্যক্তিটি উত্তর দেয়, ’কিন্তু জর্জিয়ার জন্য তার অর্থের প্রয়োজন।’ ট্রাম্প বলেন, ’সে কী চায় তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। আমি নেই।’

২৪ অক্টোবর : ট্রাম্প একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইঙ্গিত দেন যে, ডেমোক্র্যাটিক সাবেক প্রতিনিধি মেরি পেল্টোলা জিতলে তিনি আলাস্কার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেওয়া বন্ধ করে দেবেন। ট্রাম্প বলেন, ’আমি আলাস্কার জন্য ঐতিহাসিক স্তরে অবদান রেখেছি।’ এবং পরে যোগ করেন, ’ডেমোক্র্যাটরা এই গুরুত্বপূর্ণ রিপাবলিকান আসনটি চুরি করার চেষ্টা করছে এবং তা যদি ঘটে, তবে আলাস্কার জন্য আমরা যা কিছু করেছি, তা অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাবে।’

এই মন্তব্যগুলোর কোনোটি কৌতুক হিসেবে প্রকাশ করা হোক বা আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হোক না কেন, সবগুলোর মূল উদ্দেশ্য একদম স্পষ্ট। ট্রাম্প চান আমেরিকানরা রিপাবলিকানদের ভোট দেওয়ার বিষয়টিকে তার পক্ষ থেকে তাদের পছন্দের জিনিস পাওয়ার সাথে মিলিয়ে দেখুক। কিন্তু রিপাবলিকানরা জিতলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি যেভাবে এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারতেন, আজও তার কাছে ঠিক ততটুকুই ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে হয়।

হারিকেন, ত্রাণ এবং ক্যাম্প লেজুনের কারণে বছরের পর বছর ধরে ভুগছেন এমন ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের মতো মারাত্মক ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়েও ট্রাম্প এই ধরনের লেনদেনের প্রস্তাব দিতেও দ্বিধা করেননি। 

তবে ট্রাম্পের এই লেনদেনমূলক কৌশল রাজনৈতিকভাবে ভালো ফল দেবে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, জরিপগুলো ইঙ্গিত করছে যে ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের প্রস্তাবটি খুব একটা ইতিবাচক সাড়া পায়নি। গত মাসে একটি জরিপে দেখা গেছে যে নিবন্ধিত ভোটারদের অধিকাংশই মনে করছেন, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিটি অনুপযুক্ত ছিল।

সাম্প্রতিক আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, ৬ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ১ জনেরও কম মনে করেন যে রিপাবলিকানরা জিতলে তারা বাস্তবে এই অর্থ পাবেন। অধিকাংশ ভোটারই বলেছেন যে, ট্রাম্পের এই ধারণা সমর্থনকারী কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ার চেয়ে বরং তাদের ভোট না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু সেই জরিপগুলো ট্রাম্পকে আরও বেশি লেনদেনমূলক প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বরং, ২০২৬ সালের নির্বাচনি প্রচারণার এই শেষ মুহূর্তে এসে তা আরও গতি পেয়েছে।