চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠক। রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক বছরে চীনের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে।

এই বৈঠককে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ক্ষমতা সুসংহত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

সোমবার (২৬ আক্টোবর) শুরু হওয়া চার দিনের এই বৈঠকটি ‘ফিফথ প্লেনাম’(পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) নামে পরিচিত। এতে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় ৩০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা আরো কঠোর হতে পারে।

চীনের রাজনীতিতে এ ধরনের বৈঠক সাধারণত অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয় না। 

 

তবে অধিবেশন শেষে সিদ্ধান্তগুলোর একটি সংক্ষিপ্তসার এবং পরে বিস্তারিত নথি প্রকাশ করা হবে। বৈঠকটির সিদ্ধান্ত শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ভবিষ্যৎ নয়, চীনের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

 

প্লেনাম কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্লেনাম হলো চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এসব বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতারা একত্রিত হয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন। সাধারণত বছরে অন্তত একবার এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির পাঁচ বছর মেয়াদি কার্যকালে সাধারণত সাতটি প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকের সিদ্ধান্ত থেকে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের অগ্রাধিকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

এবারের প্লেনাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী ‘পার্টি কংগ্রেস বা বা জাতীয় সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হতে আর মাত্র এক বছর বাকি। ওই কংগ্রেসে দলের আগামী দিনের নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে এবং নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। ফলে এবারের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত চীনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করে। তবে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রকৃত প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মধ্যেই গোপন রাখা হয়।

পরবর্তী পার্টি কংগ্রেসে শি চিনপিং আবারও চীনের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, তার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদের ওপর আগে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা তুলে নেওয়ায় তার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।

এবারের প্লেনামের আলোচ্যসূচিতে কী রয়েছে?

অতীতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে (প্লেনাম) শি চিনপিংয়ের অবস্থান সুসংহত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব অধিবেশনের একটিতে তাকে দলের ‘কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়, যা তাকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। একই সঙ্গে, তার রাজনৈতিক দর্শন ‘শি চিনপিং চিন্তাধারা’ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শিক কাঠামোয় বিশেষ মর্যাদা পায়।

এবারের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শির জন্য পরবর্তী পার্টি কংগ্রেসের আগে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তিনি দলের নীতিগত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির সামঞ্জস্য বজায় রাখার পাশাপাশি দলের প্রতিনিধিদের আনুগত্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারেন।

বৃহস্পতিবার শেষ হতে যাওয়া এই বৈঠকটি কোথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। অতীতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন বেইজিংয়ের জিংসি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২১ সদস্যের শক্তিশালী পলিটব্যুরো জানিয়েছে, এবারের অধিবেশনে ‘দলের সামগ্রিক কঠোর শাসনব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নেওয়ার’ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, দলের দূরের এলাকার কর্মকর্তারাও যেন শি চিনপিংয়ের প্রতি অনুগত থাকেন এবং ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দলের ভেতরে সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানে অনেক কর্মকর্তা বাদ পড়ায় এবারের বৈঠকে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা চারপাশে খালি চেয়ারগুলো দেখলে তাদের মনে ভয় ও উদ্বেগ কাজ করতে পারে।

দুর্নীতি, এমনকি ‘নৈতিক দুর্নীতি’র অভিযোগেও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নৈতিক দুর্নীতি’র অভিযোগ শি চিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্যহীনতার বিষয়টি মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কারণ, দলের প্রতি অনুগত না থাকাকে নৈতিকতার লঙ্ঘন হিসেবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

‘এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়োগ পাওয়া ৪৪ জন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুজন স্বপদে বহাল রয়েছেন।

চীনের সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অত্যন্ত প্রভাবশালী সাত সদস্যের ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’-এর সদস্যসংখ্যাও কমে মাত্র দুজনে দাঁড়িয়েছে। তাদের একজন শি চিনপিং এবং অন্যজন একজন জেনারেল।

এবারের প্লেনাম বা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শি চিনপিংয়ের জন্য এই কমিশনে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে সামরিক নেতৃত্বে শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।