সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আর মাত্র ১৪ দিনের তেল গচ্ছিত রয়েছে। এমন দাবি ঘিরে শোরগোল শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে।
দাবির পক্ষে একটি সরল হিসাব দেখানো হচ্ছে, দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে (এসপিআর) রয়েছে ২৮৬.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং তারা দৈনিক ব্যবহার করে প্রায় ২০.৭ মিলিয়ন ব্যারেল। একটিকে অন্যটি দিয়ে ভাগ করলে ফল পাওয়া যায় ‘১৪ দিন’!
দাবিটি সোজাসাপ্টা মনে হলেও আদতে এই গাণিতিক হিসাব মারাত্মক ভুল ও বিভ্রান্তিকর। তবে এই ভাইরালের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের একটি সত্যিকারের বড় উদ্বেগের চিত্র।
ভুল হিসাবটি মূলত দুটি ভিন্ন জিনিসকে গুলিয়ে ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, এই দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত উৎপাদনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। বিষয়টি এমন এক হিসাবের মতো দাঁড়ায়, যেন একটি পরিবার প্রতিদিন বাজারে কতটুকু কেনাকাটা করছে বা রান্না করছে তা না গুনে, কেবল ঘরে মজুদ থাকা খাবার দেখে বলে দেওয়া হলো—‘তাদের খাবার শেষ হতে আর ১৪ দিন বাকি!’
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেবল জরুরি মজুদের ওপর ভর করে চলে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল হঠাৎ ফুরিয়ে না গেলেও আসল উদ্বেগ হলো, মার্কিন আপৎকালীন জ্বালানি সুরক্ষার ‘বীমা’ এখন স্মরণকালের সবচেয়ে কম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণেই মূলত এই জরুরি তহবিল খালি হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বাইডেন প্রশাসন এসপিআর থেকে রেকর্ড ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ে। এতে জ্বালানির দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও জরুরি মজুদ বড় ধাক্কা খায়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরুদ্ধ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রাম্প প্রশাসন এসপিআর থেকে আরও ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। ফলে গত এপ্রিলে ৪১৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেলে থাকা মজুদ মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ২৮৬.৬ মিলিয়নে নেমে আসে।
আজ যদি নতুন কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, সমুদ্র অবরোধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে ওয়াশিংটনের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মতো পর্যাপ্ত ‘রসদ’ বা ‘অস্ত্র’ অবশিষ্ট নেই।
জরুরি রিজার্ভ থেকে প্রতিদিন এভাবে তেল ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভব নয়। আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু-হু করে লাফিয়ে বাড়তে পারে। এ ছাড়া বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী গৃহীত এই তেল ভবিষ্যতে চড়া দামে কিনে আবার সরকারি গুদামে ভরতে হবে, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।


