যুক্তরাষ্ট্রে আবারও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। একসময় ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, ক্যাব মিটার টেম্পারিংসহ বিভিন্ন অপরাধে কিছু বাংলাদেশির নাম সংবাদে এলেও, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর (টেক সাপোর্ট) প্রতারণা ও আর্থিক স্ক্যামেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসছে। একদিকে পরিশ্রমী, সৎ ও সফল অভিবাসী হিসেবে বাংলাদেশিদের ইতিবাচক পরিচিতি থাকলেও, অন্যদিকে অল্প কিছু ব্যক্তির অপরাধ পুরো কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিউজার্সির রিভারসাইড টাউনশিপে সম্প্রতি এমনই এক ঘটনায় এক নারী প্রতারণার শিকার হয়ে ২৫ হাজার ডলার নগদ হারিয়েছেন। রিভারসাইড টাউনশিপ পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তার কম্পিউটারে একটি ভুয়া "ভাইরাস সতর্কতা" (পপ-আপ) প্রদর্শিত হয়। সেখানে দেওয়া নম্বরে ফোন করলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, ওই নারীর কম্পিউটার থেকে ব্যাংকের নেটওয়ার্কে ভাইরাস ছড়িয়েছে।
এরপর তাকে ভয় দেখানো হয় যে, এফবিআইয়ের তদন্ত এড়াতে হলে ২৫ হাজার ডলার নগদ তুলে একটি বাক্সে ভরে বাড়ির বাইরে রাখতে হবে, যাতে ব্যাংকের কথিত প্রতিনিধি এসে তা সংগ্রহ করতে পারেন। আতঙ্কিত হয়ে তিনি নির্দেশনা অনুসরণ করেন এবং একজন এসে সেই অর্থ নিয়ে যায়। পরে প্রতারকরা আরও ৩০ হাজার ডলার একইভাবে প্রস্তুত রাখতে বলেন।
দ্বিতীয়বার অর্থ চাওয়ার পর ওই নারীর সন্দেহ হলে তিনি রিভারসাইড পুলিশকে বিষয়টি জানান। পুলিশ তার সহযোগিতায় একটি ফাঁদ পাতে। নির্ধারিত সময়ে দ্বিতীয় দফার অর্থ সংগ্রহ করতে এলে ঘটনাস্থল থেকেই দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন এগ হারবার টাউনশিপের বাসিন্দা এমডি এন. ইসলাম (৪৮) এবং ওয়েস্টভিলের বাসিন্দা মোহাম্মদ জেড. ইসলাম (৫৮)। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক উপায়ে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতের সমনের মাধ্যমে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় কারও কাছে অতিরিক্ত তথ্য থাকলে রিভারসাইড পুলিশ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার আপশার কাউন্টিতেও একই ধরনের একটি প্রতারণা মামলায় গ্রেপ্তার হন বাফেলো, নিউইয়র্কের বাসিন্দা নাইমাত উল্লা (৩১)।
তদন্তে জানা যায়, একটি ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেনের সূত্র ধরে আপশার কাউন্টি শেরিফের অফিস ও রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের তদন্তকারীরা যৌথভাবে একটি "মানি ড্রপ" অভিযান পরিচালনা করেন। নির্ধারিত স্থানে অর্থ সংগ্রহ করতে এলে নাইমাত উল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার নগদ, স্বর্ণমুদ্রা এবং একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তিনি বর্তমানে একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত এবং ৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার জামিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিউজার্সি ও পশ্চিম ভার্জিনিয়ার দুটি ঘটনার মধ্যে মিল রয়েছে—প্রযুক্তির মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি, নগদ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং সংগঠিত প্রতারণা চক্রের উপস্থিতি। তবে একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধ কখনোই পুরো বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির পরিচয় বহন করে না। লক্ষাধিক আইন মেনে চলা, পরিশ্রমী ও সৎ বাংলাদেশি অভিবাসীর অবদানের সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে প্রতিটি এমন ঘটনা কমিউনিটির জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞ মানুষ এ ধরনের প্রতারণার সহজ শিকার হয়ে থাকেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—কোনো বৈধ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনো ফোন করে গ্রাহককে নগদ অর্থ তুলে বাড়ির বাইরে রাখতে বলে না। একইভাবে এফবিআই বা অন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও ফোনে অর্থ দাবি করে গ্রেপ্তার এড়ানোর সুযোগ দেয় না। এমন কোনো ফোনকল বা নির্দেশনা পেলে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে।
সচেতনতা বাড়ানোই এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে কমিউনিটির তরুণদেরও দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে কোনো সন্দেহজনক চক্রে জড়িয়ে না পড়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।


