নিউইয়র্কের হোয়াইট প্লেইন্সে ৩–৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হলো ৪৫তম বঙ্গ সম্মেলন। ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টি সেন্টারে আয়োজিত এ সম্মেলনে বরাবরের মতো অংশ নেয় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা পরিবার।
সাহিত্য উৎসবের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হয় দুটি বিশেষ আলোচনা— ‘সাহিত্য সৃষ্টিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব’ এবং ‘জন্মশতবর্ষে মহাশ্বেতা দেবী’। এ আলোচনায় অংশ নেন ডা. কৌশিক সেন, জয়তী দাশগুপ্ত ও অদিতি বসু রায়। তাঁরা মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকর্ম, সমাজচেতনা এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান নিয়ে আলোকপাত করেন।
উৎসবের উদ্বোধন করেন সভাপতি দিলীপ ব্যানার্জী।
ফিফার দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে বিলম্ব করলে প্রথম আলো সাহিত্য বাসর পরিচালনা করেন সাহিত্য উৎসবের সহসভাপতি ড. ধনঞ্জয় সাহা। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি বেনজির সিকদার, যার পরিবেশনা শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়ায়। ছড়া ও কবিতা পাঠ করেন বিজ্ঞানী ও ছড়াকার ড. ধনঞ্জয় সাহা। ‘ওবেসিটি ফ্রি ওয়ার্ল্ড’-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ম্যারাথনবিদ নাসির সিকদার নিয়মিত দৌড়ের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং সুস্থ শরীর কীভাবে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশে সহায়তা করে, সে বিষয়ে বক্তব্য দেন। পরে অনুষ্ঠানে যোগ দেন আমন্ত্রিত লেখক সাদাত হোসাইন ও তসলিমা নাসরিন। তাঁরা নিজেদের রচনা থেকে পাঠ করেন। গান পরিবেশন করেন লেখক, গীতিকার ও চিকিৎসক ডা. সেজান মাহমুদ। এ পর্বে কলকাতা থেকে আগত তরুণ সংগীতশিল্পী শুভনসুন্দর এবং আবৃত্তিশিল্পী অদিতি বসু রায়ও পরিবেশনা করেন।
বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন কলকাতার আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য লেখক নলিনী বেরা। বাংলা সাহিত্যে নারী লেখকদের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন প্রকাশক রূপা মজুমদার, তসলিমা নাসরিন এবং নলিনী বেরা। পুরো অধিবেশন সঞ্চালনা করেন রুদ্রশঙ্কর।
এবারের সম্মেলনে নতুন সংযোজন ছিল বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি সোসাইটি। এ পর্বেও কবিতা পাঠ করেন কবি বেনজির সিকদার। ড. ধনঞ্জয় সাহার ছড়াকাব্যগ্রন্থ ‘পাঁচ শতকের পাঁয়তারা’ নিয়ে একটি মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ পাঠ করেন নলিনী বেরা। প্রবন্ধটি লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ড. শিবশঙ্কর পাল। ভিসাজনিত কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘পাঁচ শতকের পাঁয়তারা উজ্জ্বল নক্ষত্রখচিত পূর্ণিমার আকাশের মতো—যেখানে চমক, স্নিগ্ধতা ও ঋদ্ধতার সমন্বয় ঘটেছে। ধনঞ্জয় সাহার ছড়াবিতা উত্তর-আধুনিক, বহুমাত্রিক এবং সমাজবাস্তবতার এক অনন্য পটচিত্র। সমকালীন সমাজনীতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সময়ের প্রতিচ্ছবি তাঁর রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আধুনিক বাংলা ছড়াবিতার তিনি স্বতন্ত্র ধারার একজন স্রষ্টা।’
অন্য এক সমাপনী পর্বে সানন্দা পত্রিকার সহ সম্পাদক পায়েল সেনগুপ্ত ‘Writing in Transition’ শীর্ষক একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখি ও পাঠাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। লেখার পরিসর যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে সময়ের সীমাবদ্ধতা। তাই একজন লেখককে আগে জানতে হবে—কেন লিখছেন, কার জন্য লিখছেন এবং কোথায় লিখছেন। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “Mind is the power of creativity.”
বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি সোসাইটির পর্বে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবেশনা ছিল ভারতের দিল্লি থেকে আগত প্রখ্যাত সরোদশিল্পী ওস্তাদ কামাল সাবরির পরিবেশনায় বাংলা লোকসংগীত। তাঁর অনবদ্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অব শাড়ির সহপ্রতিষ্ঠাতা অশ্বেনী প্রসাদ নৌকায় করে বাঙালির নতুন বিশ্বে আগমনের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে একটি মনোমুগ্ধকর কাব্যিক বর্ণনা উপস্থাপন করেন। এ সময় ড. ধনঞ্জয় সাহা শাড়ি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কথা সবার সামনে তুলে ধরেন এবং উপস্থিত সবার প্রতি শাড়ি, পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য পরিধেয় নিদর্শন দানের আহ্বান জানান, যা জাদুঘরের স্থায়ী সংগ্রহে সংযোজিত হবে।
ড. সাহা আগামী ২৫–২৬ জুলাই ২০২৬ নিউইয়র্কের চেস্টনাট রিজে অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট অ্যান্ড বুক ফেয়ারে অংশগ্রহণের জন্যও উপস্থিত সবাইকে আমন্ত্রণ জানান।
সাহিত্য উৎসবের সমাপনী পর্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘ডায়াসপোরা সাহিত্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক একটি আলোচনা। এতে আলোচক হিসেবে অংশ নেন কবি বেনজির সিকদার, ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং ড. অলোক বন্দ্যোপাধ্যায়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জয়তী দাশগুপ্ত।
অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান দিলীপ চক্রবর্তী আলোচক ও অধিবেশনের সঞ্চালকদের সম্মাননা স্মারক (প্ল্যাক) প্রদান করে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানান।
উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষাভাষীদের বৃহত্তম এ উৎসবে যোগ দেন আমেরিকায় শীর্ষস্থানীয় সফল বাংলাদেশিদের একজন কে. পি. চৌধুরী। তাঁকে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার পক্ষ থেকে স্বাগত জানান সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, গোলাম ফারুক ভূঁইয়া এবং রহমান মাহবুব। তিনি প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখার এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এ ক্ষেত্রে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
সম্মেলন কেন্দ্রসংলগ্ন করিডোরে নিউইয়র্কের মুক্তধারার বইয়ের স্টলে উত্তর আমেরিকার লেখকদের বইসহ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা নিয়ে ছিল সার্বক্ষণিক ভিড়। তসলিমা নাসরিন ও সাদাত হোসাইন ব্যস্ত সময় কাটান তাঁদের ভক্ত ও পাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে।
সংক্ষিপ্ত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চলমান সময়ের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের হাতে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর স্মারক তুলে দেওয়া হয় মুক্তধারা স্টলে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কলকাতা থেকে আগত পঞ্চকবির কন্যা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়, শিতাংশু গুহ, ড. নজরুল ইসলাম, বিশ্বজিৎ সাহা, রহমান মাহবুব, সুখেন গোমেজ প্রমুখ।


