রাত পোহালেই দেশটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরায়েলিরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এই প্রথম ইহুদি রাষ্ট্রটিতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
খবর প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১০ এএম

রাত পোহালেই দেশটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরায়েলিরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এই প্রথম ইহুদি রাষ্ট্রটিতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
কালকের নির্বাচনটি আসলে কোনো ব্যক্তির নির্বাচন বা গণভোট নয়।
ইসরায়েলিরা নেসেটে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর জন্য নয়, বরং একটি দলীয় তালিকার পক্ষে ভোট দেয়। প্রতিটি দল একটি মাত্র ব্যালট পেপারে তাদের প্রার্থীদের ক্রমানুসারে সাজানো একটি তালিকা তৈরি করে, যার মাধ্যমে ভোটাররা সেই দল বা প্যানেলটিকে নির্বাচিত করেন।
সরকার গঠনের জন্য একটি দলের অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন, এবং ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো দলই কখনো এককভাবে তা অর্জন করতে পারেনি। ভোটগ্রহণের পর দলগুলো জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পায়, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। যদি কেউ জোট গঠনে সফল না হয়, তবে দেশে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালের পর এটি দেশটিতে ষষ্ঠ নির্বাচন। আর এই কারণেই ’কে প্রথম স্থান অধিকার করল’ তার চেয়ে ’কোন দল ৬১টি আসনে পৌঁছাতে পারল’ সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের ৭৮ বছরের ইতিহাসে কোনো একক দল কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এর অর্থ হলো, দলগুলোকে অবশ্যই অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমন্বয়ে একটি গভর্নিং কোয়ালিশন বা শাসক জোট গঠন করতে হয়। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন উপদলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসেন। প্রেসিডেন্ট নেসেটের এমন একজন সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যিনি সাধারণত সবচেয়ে বেশি আসন জয়ী দল বা উপদলের নেতা হয়ে থাকেন। এরপর সেই প্রার্থীকে অন্যান্য উপদলের সাথে আলোচনা করা, জোট গঠন করা এবং সরকার গঠনের জন্য একটি আস্থা ভোটে নেসেটের অনুমোদন পাওয়ার জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। তারা যদি এতে ব্যর্থ হন, তবে সেই দল বা জোট সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে পারে। যদি সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্ট অন্য একজন প্রার্থীকে নির্বাচন করতে পারেন এবং এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হবে। দ্বিতীয়বারও যদি ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচিত তৃতীয় প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে। সেটিও যদি ব্যর্থ হয়, তবে দেশে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হবে।
১৯৯৬ সালে প্রথম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বেনিয়ামনি নেতনিয়াহু। এরপর তিন দফায় প্রায় ১৯ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি সারা বিশ্বে নিজেকে ইসরায়েলের মূল মুখ হিসেবে পরিচিতি করেছেন। ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু ইসরায়েলকেও পরিচিত করেছেন যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র হিসেবেই। সমর্থকরা তাকে ‘কিং বিবি’ বলে অভিহিত করেন এবং তাকে এমন একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখেন, যার বৈরী অঞ্চলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ইসরায়েলের প্রয়োজন। তবে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-আইসিসি কর্তৃক ওয়ান্টেড হওয়া এবং ইসরায়েলে দুর্নীতির মামলায় বিচার চলাকালীন তিনি মূলত তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত করছে যে, ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে তার লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তায় বড় ধস নেমেছে, যা নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা বিষয়ক সুনামকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, যিনি গাজা যুদ্ধে তার এক ছেলেকে হারিয়েছেন। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট নিজেকে একজন রাজনৈতিক আউটসাইডার, সৈনিক হিসেবে তুলে ধরেছেন, যার নম্র পটভূমি এবং পারিবারিক আত্মত্যাগ নেতানিয়াহুর উচ্চ পদে কাটানো কয়েক দশক এবং ঝুলে থাকা দুর্নীতির মামলার সাথে এক সম্পূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি করে। তিনি ‘ইয়াশার’ নামক একটি নতুন মধ্যপন্থী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ’সৎ’। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি একজন ডানপন্থী সাবেক কমান্ডো, নেতানিয়াহুর সাবেক সহকারী এবং হাই-টেক মিলিয়নেয়ার, এই শীর্ষ পদের জন্য আরেকজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। বেনেট মধ্যপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিডের সাথে হাত মিলিয়েছেন। তাদের নতুন দলের নাম ‘টুগেদার’, এবং এর মূল বার্তাগুলো একটি আঘাতপ্রাপ্ত জাতিকে নিরাময় করা এবং দেশকে পুনরায় সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার ওপর আলোকপাত করেছে। রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে বিপরীত মেরুতে থাকা সত্ত্বেও, তাদের এই জোট ২০২১ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
নেতানিয়াহুর একসময়কার ঘনিষ্ঠ সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও নির্বাচনের মাঠে তার প্রতিদ্বন্দ্বী। নেতানিয়াহুর চেয়েও কট্টরপন্থী মনোভাবাপন্ন লিবারম্যান ২০১৮ সালে নেতানিয়াহুর সরকার থেকে পদত্যাগ করেন; তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের প্রতি অতিরিক্ত নরম হওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং নেতানিয়াহুর অন্যতম তীব্র সমালোচকে পরিণত হন। তার দল ‘ইসরায়েল আওয়ার হোম’ মূলত দেশের সাবেক সোভিয়েত অভিবাসী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সিংহভাগ সমর্থন পেয়ে থাকে।
এছাড়া সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ডেমোক্র্যাটস’ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইসরায়েলের ঐতিহাসিক লেবার পার্টি এবং অপেক্ষাকৃত ছোট বামপন্থী মেরেৎজ-এর মৃতপ্রায় অবশিষ্টাংশের ওপর ভিত্তি করে তার এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
যে দলগুলো কোনো পক্ষের সাথেই স্পষ্টভাবে জোটবদ্ধ নয়, তারা নেতানিয়াহু বা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে পাল্লা ভারী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্ট—দল দুটি ইসরায়েলের ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের পাশাপাশি রয়েছে ‘পিপল অব ইসরায়েল’ নামক একটি নতুন ডানপন্থী দল এবং ‘দ্য রিজার্ভিস্টস’ নামক একটি মধ্য-ডানপন্থী দল, উভয় দলই জনমত জরিপগুলোতে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। এতসব হিসাব-নিকাশ উল্টে যেতে পারে ভোটের বাক্সে। সবার তাই অধীর অপেক্ষা ভোটের।