শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে নতুন করে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। প্রাথমিকভাবে দেশটির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যুক্ত ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করা হবে।

সোমবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট জানান, ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হবে।

বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থার শুরু হবে ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করে। যেসব বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইরানের অর্থ লেনদেন বা দেশটির সরকারের সঙ্গে আর্থিক কার্যক্রমে সহায়তা করবে, তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়ছে চাপ

মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে বলা হচ্ছে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যবসা চালিয়ে গেলে সেই প্রতিষ্ঠানকেও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ পায় ওয়াশিংটন। বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামনে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বিশেষ করে ইরানের অর্থ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবাহিত হতে সহায়তা করা ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করা হবে।

এর আগে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র মিশরের ব্যাংক মিসর (Banque Misr)-এর সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক শাখাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকার অভিযোগে ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।

জি-২০ বৈঠকে ইরান নিয়ে চাপ

মার্কিন অর্থমন্ত্রী বর্তমানে উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত জি-২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর প্রতি ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমানোর আহ্বান জানাতে পারেন বেসেন্ট। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও সমন্বিত করা হোক।

বিশেষ করে ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা চীনের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’

ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন যে বৃহত্তর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ (Operation Economic Outcast)। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনৈতিক আয়ের উৎস, আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের পথ সংকুচিত করা।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহেও ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন খাতকে লক্ষ্য করে নতুন ব্যবস্থা নিয়েছিল। এর মধ্যে ডিজিটাল সম্পদ, সোনা, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন খাতও রয়েছে।

সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই অর্থনৈতিক চাপ

ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও আবার বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক কৌশল তাই শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয় নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে।

বেসেন্টের ঘোষণা অনুযায়ী, সামনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আরও ঘন ঘন এবং কঠোর হতে পারে। ব্যাংকগুলোকে দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী পর্যায়ে আরও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক নেটওয়ার্ক এর আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।