মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের তীব্র আপত্তির মুখে সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে (জামুকা) না জানিয়েই পাঠ্যপুস্তকে মুদ্রিত সংজ্ঞায় আনা হয়েছিল পরিবর্তন। এ বিষয়ে অনুমোদন নিতে জামুকার সভায় তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ও সংস্থাটির চেয়ারম্যান ফারুক-ই-আজম উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব উত্থাপন করলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামুকার সদস্যরা।
তারা সাফ জানিয়ে দেন—মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং আলবদর, রাজাকার ও আলশামস বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
দৈনিকটি জানিয়েছে, ওই সময় জামুকা সদস্যদের তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদের মুখে উপদেষ্টা পরিষদের প্রস্তাবটি নাকচ হলে সিদ্ধান্ত হয়, মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম নামের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দ যোগ হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া এমন প্রচেষ্টার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জামুকার তৎকালীন সদস্য ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে না পারায় বিব্রত হন উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। জামুকা সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার কারণেই তিনি এটা করতে পারেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর ১০ মে হয় জামুকার ৯৬তম সভা। তাতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। উপস্থিত ছিলেন জামুকার সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান (বীর-উত্তম), ক্যাপ্টেন (অব.) এম নুরুল হুদা, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান, মেজর (অব.) কাইয়ুম খান, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক আহমেদ খান, হাবিবুল আলম, খ. ম. আমীর আলী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব ইসরাত চৌধুরী ও জামুকা মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন।
মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রেখে বৈঠকে ফারুক-ই-আজম বলেন, ‘গত ৬ মে উপদেষ্টা পরিষদ সভায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২ সংশোধনকল্পে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
সভায় জানানো হয়, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকে এসংক্রান্ত রচনায় সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনীগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ওই সংজ্ঞার সঙ্গে মিল রেখে সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধ/মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ২(১১) এবং ২/১৩) উপধারায় ‘মুজাহিদ বাহিনী, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
ফারুক-ই-আজম আরো বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদের সভার পরামর্শমতে সংশোধন বা পরিমার্জনের লক্ষ্যে কাউন্সিলের সদস্যদের মতামতের জন্য উপস্থাপন করা হলো।’ সঙ্গে সঙ্গে সভায় উপস্থিত জামুকার সদস্যরা তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান।
সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান বীর-উত্তম তখন বলেন, ‘আমরা সবাই জানি কাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আলবদর, আলশামস— এদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, এটিই সত্য ইতিহাস।’
জামুকাকে না জানিয়ে পাঠ্যপুস্তকের রচনায় কিভাবে সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হলো, সে প্রশ্ন তুলে তীব্র অসন্তোষ জানিয়ে অন্য সদস্য মেজর (অব.) কাইয়ুম খান মন্তব্য করেন, পাঠ্যপুস্তকে কী সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার যেকোনো সংজ্ঞা একমাত্র জামুকাই দেবে।
উপদেষ্টা পরিষদের এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকারী আরেক সদস্য মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমানের ভাষ্য, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতে পারি না। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, দালাল শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এটি সুপ্রতিষ্ঠিত।’
সদস্য হাবিবুল আলম বলেন, বিদ্যমান জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২-এ ‘মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো আছে। এগুলো যথার্থভাবেই আইন/আদেশ/প্রজ্ঞাপনে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসও তাই। এ ছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮-এর ২(১১) ও ২(১৪) নম্বর ধারায় যথাক্রমে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় জামায়াতে ইসলামীর কথা বর্ণিত আছে। ওই শব্দগুলো প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বাদ দেওয়া সমীচীন হবে না।


