শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: ইরানের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি ব্যাংককে আর্থিক সেবা দেওয়ার অভিযোগে কিউবার রাষ্ট্রায়ত্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাংকের (Banco Internacional de Comercio, S.A.—BICSA) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন। রুবিওর বিবৃতি অনুযায়ী, কিউবার ব্যাংকটি অন্তত ২০২২ সাল থেকে ইরানের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কারাফারিন ব্যাংককে (Karafarin Bank) সেবা দিয়ে আসছে। ২০২০ সালে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় নির্বাহী আদেশ ১৩৯০২-এর আওতায় ইরানের ওই ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কিউবার অর্থনীতির আর্থিক সেবা খাতে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে নির্বাহী আদেশ ১৪৪০৪-এর আওতায় BICSA-কে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইরানের আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয় করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে রুবিও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিস্ট শাসিত কিউবা ইরানসহ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তিনি ইরানকে সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতাকারী বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেন। রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে একশ মাইলেরও কম দূরত্বে কোনো বৈরী রাষ্ট্রের সামরিক, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ ট্রাম্প প্রশাসন মেনে নেবে না।

তিনি আরও বলেন, কিউবার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরান এবং অন্যান্য বিপজ্জনক ও বৈরী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর আর্থিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যোগাযোগ শনাক্ত এবং বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্বাহী আদেশ ১৪৪০৪-এর আওতায় কিউবার শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তা কাঠামোকে সহায়তাকারী, দেশটিতে দমন-পীড়নের জন্য দায়ী এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে—এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রয়েছে।

এ পদক্ষেপ কিউবা সরকারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় জারি করা নির্বাহী আদেশ ১৪৩৮০ এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক প্রেসিডেনশিয়াল মেমোরেন্ডাম ৫-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অবাধ বাজার ও বেসরকারি উদ্যোগের প্রসার এবং কিউবায় গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করা।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত সব সম্পদ এবং মার্কিন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখল কিংবা নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ জব্দ থাকবে। এসব সম্পদের তথ্য মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরে (ওএফএসি—OFAC) জানাতে হবে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক বা সম্মিলিত মালিকানায় কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অংশ থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।

আইনগত অনুমোদন বা অব্যাহতি না থাকলে মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত পক্ষের সম্পদ নিয়ে লেনদেন করা নিষিদ্ধ। একইভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে অর্থ, পণ্য বা সেবা দেওয়া কিংবা তাদের কাছ থেকে এসব গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।

বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নির্বাহী আদেশ ১৪৪০৪-এর আওতায় নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিউবার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী, ধাতু ও খনি, আর্থিক সেবা এবং নিরাপত্তা খাতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি পক্ষগুলোর ক্ষেত্রেও এ ঝুঁকি প্রযোজ্য হতে পারে।

বিশেষ করে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত পক্ষের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য দেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে ওই পক্ষের ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করলেও বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ ছাড়া, কিউবা বা কিউবার কোনো নাগরিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে মার্কিন আইনাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ওপরও কিউবা-সম্পর্কিত সম্পদ নিয়ন্ত্রণবিধির অধীনে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে অনুমোদিত বা আইনগতভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত লেনদেন এর বাইরে থাকবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষভাবে চিহ্নিত নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ও সম্পদ অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের তালিকা (এসডিএন তালিকা—SDN List) থেকে নাম প্রত্যাহারের আবেদন করতে হলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পুনর্বিবেচনা পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসংক্রান্ত নির্দেশিকাও অনুসরণ করা যাবে।