শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক — জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে শান্তি চুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতা দ্রুত হতে পারে বলে জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প ইরান, ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, মেক্সিকো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জাতিসংঘ সংস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু তুলে ধরেন।
ইরানের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। শান্তি চুক্তি না হলে ইরানকে “ধ্বংস” করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে একই ভাষণে ট্রাম্প বলেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি বিশ্বাস করেন নির্বাচনের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
“আমরা এটি সমাধান করব,” বলেন ট্রাম্প। তিনি আরও বলেন, অনেকের ধারণার চেয়েও দ্রুত এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। ভেনেজুয়েলা ও পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের আশপাশে কোনো হুমকিকে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে দেবে না। প্রয়োজন হলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে বলেও জানান তিনি।
কিউবার বিষয়ে ট্রাম্প দেশটিকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য তার প্রশাসনের প্রচেষ্টার কথা জানান। তিনি বলেন, “কমিউনিজম কখনো আমেরিকায় আসবে না, কিন্তু স্বাধীনতা কিউবায় আসবে।”
রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প কিউবা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় দেশটির জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। মেক্সিকোর প্রসঙ্গও আসে ট্রাম্পের ভাষণে। তিনি দেশটিতে মাদক কার্টেল সহিংসতার বিষয়ে সমালোচনা করেন এবং কার্টেলবিরোধী অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। এসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ছিল ট্রাম্পের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি জানান, তার প্রশাসন সরকারি যোগাযোগে “Artificial Intelligence”-এর পরিবর্তে “Super Intelligence” শব্দটি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে। ট্রাম্প বলেন, এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চীন ও অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রযুক্তিটির বিকাশে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেন এবং এআইকে শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসিরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের ওপর আদালটির এখতিয়ার থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করে তিনি সদস্য দেশগুলোকে আদালটি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। জাতিসংঘ নিয়েও সমালোচনা ও সংস্কারের কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি জাতিসংঘের আমলাতন্ত্র ও ব্যয় কমানোর পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাটিতে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান।
বিশ্বজুড়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নিউইয়র্কে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।


