যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হয়েছে। বিরল এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে জড়ো হন হাজারো মানুষ।
খবর প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হয়েছে। বিরল এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে জড়ো হন হাজারো মানুষ।
যুক্তরাজ্য থেকে দেখা গেছে আংশিক সূর্যগ্রহণ। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন দেশটির বেশির ভাগ এলাকা থেকে দেখা যায়, চাঁদ সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে ফেলেছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথ শুরু হয় রাশিয়ার সাইবেরিয়ার উত্তর প্রান্ত থেকে। এরপর তা আর্কটিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে এগিয়ে আইসল্যান্ডে পৌঁছায়। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যুক্তরাজ্যের ওপর দিয়ে যায়।
সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ চশমা ব্যবহার করেন অনেকে। তবে গ্রহণের আগে এসব চশমার ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। চশমার দোকানের পাশাপাশি হার্ডওয়্যারের দোকান ও বেকারিতেও এগুলো বিক্রি হয়ে যায়। যারা চশমা পাননি, তাদের কেউ কেউ নিরাপদভাবে আংশিক গ্রহণ দেখার জন্য ছাঁকনি, খাবারের বাক্স ও কাগজের টুকরা ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছিল, সরাসরি খালি চোখে সূর্যের দিকে না তাকাতে। কারণ সূর্যের তীব্র আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চলে আসে। তখন চাঁদ সূর্যের আলো পুরোপুরি বা আংশিকভাবে আটকে দেয়। ফলে পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে চাঁদের ছায়া পড়ে। চাঁদ যত সামনে এগিয়ে যায়, সূর্যের আরো বেশি অংশ ঢেকে যায়। এতে দিনের আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। অনেকটা ঘরের আলোর উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেওয়ার মতোই পরিস্থিতি তৈরি হয়। যুক্তরাজ্য থেকে দেখা গ্রহণটি ছিল আংশিক। কারণ ওই সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি এক সরল রেখায় ছিল না। ফলে চাঁদ সূর্যের পুরো অংশ ঢাকতে পারেনি। ১৯৯৯ সালের পর যুক্তরাজ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢাকা পড়ে।
স্পেনের কিছু এলাকায় মানুষ আরো বিরল দৃশ্য দেখার সুযোগ পান। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে, অর্থাৎ ব্রিটিশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়, সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি এক সরল রেখায় চলে আসে। তখন শুরু হয় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। এই দৃশ্য দেখতে চিলি থেকে স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লা কোরুনিয়ায় যান বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিচে। তিনি বলেন, পূর্ণগ্রহণের সময় সবাই আনন্দে চিৎকার করছিলেন এবং দেখা দৃশ্য নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। তার ভাষায়, সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তার মন্তব্য, ‘মহাবিশ্ব অসাধারণ।’ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পুরো সূর্যকে ঢেকে ফেলে। তখন সূর্যের চারপাশে একটি ম্লান আলোর বলয় দেখা যায়। এটি সূর্যের করোনা। করোনা হলো সূর্যের বাইরের অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর, যা মহাকাশে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। কিছু দর্শক সূর্যের পেছন থেকে গোলাপি রঙের ছোট ছোট গ্যাসের লুপও দেখতে পারেন। এগুলোকে বলা হয় প্রমিনেন্স। সূর্যের অস্থির চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে এসব গ্যাসের গঠন তৈরি হয়। এরপর চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে থেকে সরে যায়। আবার সূর্যের আলো দেখা দিতে শুরু করে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সাধারণত খুব অল্প সময় স্থায়ী হয়। এই গ্রহণের পূর্ণ পর্যায়ও দুই মিনিটের কম সময় স্থায়ী হয়। তবে যারা এটি দেখেছেন, তাদের অনেকের কাছেই এটি জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
পৃথিবীর কোনো না কোনো জায়গা থেকে প্রায় ১৮ মাসে একবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা অনেক বেশি বিরল। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এমন ঘটনা গড়ে প্রায় ৪০০ বছরে একবার দেখা যেতে পারে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সম্ভব হওয়ার পেছনেও রয়েছে একটি আশ্চর্য কাকতালীয় বিষয়। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য চাঁদের চেয়ে পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে। একই সময়ে সূর্যের ব্যাস চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড়। এই কারণে পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে তাকালে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। ফলে চাঁদ সূর্যের সামনে এসে সেটিকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে। চাঁদ যদি সামান্য ছোট হতো, অথবা পৃথিবী থেকে তার কক্ষপথ কিছুটা দূরে হতো, তাহলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হতো না।
২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ সময় আসছে। এই সময়ে তারা তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন। তবে এসব গ্রহণের কোনোটিই যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণ অবস্থায় দেখা যাবে না। যুক্তরাজ্যে ২০২৭ সালে সর্বোচ্চ যে সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, সেটিও হবে আংশিক। ওই সময় দেশটির কিছু এলাকায় সূর্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢাকা পড়তে পারে। আজকের গ্রহণের চেয়ে বেশি অংশ ঢাকা পড়া সূর্যগ্রহণ দেখতে যুক্তরাজ্যবাসীকে আরো কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে। ২০৮১ সালে দেশটি থেকে এমন একটি গ্রহণ দেখা যাবে, যখন সূর্যের সর্বোচ্চ ৯৯ শতাংশ ঢাকা পড়বে। আর যুক্তরাজ্য থেকে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।