NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, রবিবার, মে ২৪, ২০২৬ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
আগামী এক বছর ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর ভারত-মার্কিন সর্ম্পক দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, বললেন রুবিও পাক সেনাপ্রধানের তেহরান সফর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গোল উৎসবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতল বার্সেলোনা নিউ ইয়র্কে শুরু ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডপ্রত্যাশীদের নিজ দেশ থেকেই আবেদন করতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা থেকে তুলসী গ্যাবার্ডের পদত্যাগ নিউইয়র্কে ড্রাই ডকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ১ নীল গাউনে কানের মঞ্চ মাতালেন ঐশ্বরিয়া
Logo
logo

শুরু হলো ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা


খবর   প্রকাশিত:  ২৪ মে, ২০২৬, ০৯:০৫ এএম

শুরু হলো ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকায় তাঁর প্রথম সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচিতিই ছিল তাঁর প্রধান সম্বল। আজকের প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং এ নিয়ে বিতর্কের অবসানের আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিক ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।

উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ‘৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ ২২ মে শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে উৎসবমুখর পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ২৫ মে সোমবার পর্যন্ত চলবে চারদিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক আয়োজন।

অনুষ্ঠানমঞ্চে দেওয়া বক্তৃতায় অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, আমাদের প্রজন্মের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ধারণা ছিল ভিত্তিমূলের মতো দৃঢ়। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দুই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের এই আলোচনা পর্বটি সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম।

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, বাংলা গ্রন্থ অনুবাদের একটি বড় উদ্যোগ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। তিনি নিউইয়র্ক বইমেলায় বাংলাদেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করেন।

এর আগে অনুষ্ঠানমঞ্চে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা বইমেলায় উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।

শুক্রবার বিকেল থেকেই বইপ্রেমী, লেখক, পাঠক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণ। চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া যেন উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সন্ধ্যা ঘনানোর আগেই উপচে পড়া ভিড়ে পরিণত হয় মেলা প্রাঙ্গণ। দেশীয় পোশাকে সজ্জিত প্রবাসী বাঙালিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বইকে কেন্দ্র করে এক অনন্য মিলনমেলায় অংশ নেন।

নিউইয়র্কে বইকে কেন্দ্র করে এমন প্রাণবন্ত, আবেগঘন এবং বৃহৎ আয়োজন অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না—এ কথা অনেক দর্শনার্থীর মুখেই শোনা গেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশকেরা ইতোমধ্যেই নিউইয়র্কে এসে পৌঁছেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য—নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডা এবং দূরবর্তী অঙ্গরাজ্য থেকেও বহু মানুষ বইমেলায় যোগ দিতে এসেছেন। প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এটি যেন বইকে কেন্দ্র করে এক বার্ষিক পুনর্মিলনী।

প্রবাসী বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে ১৯৯২ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করেছিল এই বইমেলা। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ এটি উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষাভাষীদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আয়োজক মুক্তধারা ফাউন্ডেশন এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে— “যত বই তত প্রাণ”।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁকে প্রদান করা হয় ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে তাঁর অবদান অসামান্য।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগরসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আগত বহু লেখক, কবি, গবেষক ও শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় ঢোলের বাদ্য এবং রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে। ছিল আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও বিশেষ স্মরণানুষ্ঠান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব—মহাশ্বেতা দেবী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন এবং তপন রায়চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

মেলায় অংশ নিয়েছে অনন্যা, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রথমা প্রকাশন, আহমেদ পাবলিশার্স, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশসহ বাংলাদেশ ও কলকাতার বহু খ্যাতিমান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। নতুন প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ, প্রবাসভিত্তিক সাহিত্য, শিশু-কিশোর বই এবং বিশ্বসাহিত্যের নানা প্রকাশনা পাঠকদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

চারদিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রতিদিন থাকবে বই বিক্রি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং প্রবাসী সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ও বইপড়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়াই এবারের বইমেলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক শিল্পপতি গোলাম ফারুক ভূঁইয়া বলেন, দেশ থেকে দূরে থেকেও বাংলাদেশিরা বাংলা বইয়ের টানে এই মেলায় যোগ দেন। সুস্থ সংস্কৃতি ও মননশীলতার বিকাশে এ বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বইয়ের ঘ্রাণ, প্রিয় মুখের হাসি, বাংলা ভাষার আবেগ আর প্রবাসের মাটিতে শেকড়ের টান—সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে আবারও প্রমাণ হলো, বাংলা বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এখনও অটুট, এখনও প্রাণবন্ত। “যত বই তত প্রাণ”—এই উচ্চারণে চারদিনের জন্য যেন প্রবাসের হৃদয়ে গড়ে উঠেছে এক টুকরো বাংলাদেশ।