শিব্বীর আহমেদঃ মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, তার ভেতরে একটি দেশ বেঁচে থাকে। সেই দেশের নাম জন্মভূমি। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ দেশ ছাড়ে। নতুন শহরে যায়। নতুন ভাষা শেখে। নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। কেউ নতুন নাগরিকত্ব নেয়। কেউ বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যায়। তবু শেকড় থেকে যায় শেকড়ের জায়গাতেই। শৈশবের উঠান থেকে যায়। মায়ের হাতের ভাতের গন্ধ থেকে যায়। গ্রামের মেঠোপথ থেকে যায়। বর্ষার কাদা, শীতের সকালের নরম রোদ, পুকুরঘাট, নদীর পাড়—সবই থেকে যায় স্মৃতির গভীরে। প্রবাসে বসে হঠাৎ কোনো বাংলা গান শুনলে মনটা যেন কেমন করে ওঠে। পরিচিত কোনো খাবারের গন্ধ পেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দেশ। নিজের ভাষায় কারও কথা শুনলে মনে হয়, বহু দূরের কোনো আপন মানুষকে খুঁজে পাওয়া গেছে। এই অনুভূতির নামই শেকড়ের টান। এই টান পৃথিবীর কোনো সীমানা মানে না।

প্রবাসজীবন বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক কঠিন। একজন প্রবাসীকে প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করতে হয়। তাকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। নিজের আরাম বিসর্জন দিতে হয়। পরিবারকে সময় দিতে হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে হয়। বাড়িভাড়া, কর, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যদিনের নানা ব্যয় সামলাতে হয়। তারপরও সে দেশে টাকা পাঠায়। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটায়। মা-বাবার চিকিৎসার খরচ দেয়। ভাই-বোনের পাশে দাঁড়ায়। দেশে বাড়ি করে। জমি কেনে। কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। কেউ গ্রামের স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ দেয়। এর পেছনে শুধু দায়িত্ব নেই। আছে ভালোবাসা। আছে দেশের প্রতি এক ধরনের অদৃশ্য দায়বদ্ধতা। তাই প্রবাসীর পাঠানো অর্থকে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর প্রতিটি ডলারের সঙ্গে মিশে থাকে একজন মানুষের পরিশ্রম। মিশে থাকে তার ঘাম। মিশে থাকে তার পরিবারের স্বপ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই অবদানের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই অঙ্ক বেড়ে প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের সঙ্গে প্রবাসীদের আর্থিক সম্পর্ক দুর্বল হয়নি। বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক আর মানসিক আস্থা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ টাকা পাঠাতে পারেন দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু জীবনের শেষ সময় কোথায় কাটাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেন নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা ভেবে। এই পার্থক্যটি আমাদের বুঝতে হবে।

বহু প্রবাসীর একটি স্বপ্ন থাকে। জীবনের কর্মব্যস্ত সময় শেষ হলে দেশে ফিরবেন। নিজের মাটিতে একটি ছোট বাড়ি করবেন। সকালে বারান্দায় বসে চা খাবেন। পরিচিত মানুষের সঙ্গে গল্প করবেন। পুরোনো বন্ধুদের খুঁজবেন। গ্রামের পথে হাঁটবেন। শৈশবের জায়গাগুলো আবার দেখবেন। সন্তানদের বলবেন, এখানেই তার শেকড়। একদিন সেই মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন। এই স্বপ্ন হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এর গভীরতা অনেক। কারণ প্রবাসীর কাছে দেশে ফেরা শুধু একটি ভ্রমণ নয়। এটি শেকড়ে ফিরে যাওয়া। এটি জীবনের একটি অসমাপ্ত অধ্যায় শেষ করা। এটি নিজের মাটির কাছে ফিরে আসা।

কিন্তু সেই স্বপ্নের সামনে যখন অনিশ্চয়তা দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন জাগে। দেশ কি নিরাপদ আছে? নিজের বাড়ি কি নিরাপদ আছে? জমি কি নিরাপদ আছে? দেশে না থাকলে সম্পত্তির দেখভাল কে করবে? কোনো বিরোধ হলে বিচার পাওয়া যাবে কি? স্থানীয় প্রভাবশালী কেউ যদি সম্পত্তির দিকে নজর দেয়, রাষ্ট্র কি পাশে দাঁড়াবে? থানায় গেলে অভিযোগ গুরুত্ব পাবে তো? রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় ক্ষমতার কারণে আইনের প্রয়োগ কি বদলে যাবে? একজন প্রবাসীর মনে এসব প্রশ্ন তৈরি হলে তার স্বদেশপ্রেম কমে যায় না। কিন্তু দেশে ফিরে যাওয়ার সাহস কমে যেতে পারে। আর এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪ একটি বড় পরিবর্তনের দিন। আন্দোলনের মুখে একটি সরকারের পতন ঘটে। দেশ প্রবেশ করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। সেই আন্দোলনের পেছনে হয়ত ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। ছিল অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবি। হয়ত ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ। কিন্তু আন্দোলনের সময় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের মাধ্যমে বিচার। কোনো রাষ্ট্র অতীতের অন্যায়কে চাপা দিয়ে সামনে এগোতে পারে না।

কিন্তু একটি সরকারের পতনের পর আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কীভাবে দ্রুত স্বাভাবিক করা হবে? ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ স্থাপনায় হামলা হয়। বহু পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত হয়ে পড়েন। কোথাও কোথাও আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। এর প্রভাবও দেখা যায়। অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল মব সহিংসতার ঘটনা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মব সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

মবের হাতে বিচার কোনো বিচার নয়। এটি বিচারব্যবস্থার অস্বীকার। একজন মানুষ অপরাধী হলে তার বিচার হবে। কিন্তু সেই বিচার আদালতে হবে। রাস্তায় নয়। জনতার হাতে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের ভিত্তিতে নয়। কারণ আজ যে জনতা একজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, কাল সেই জনতার লক্ষ্য যে অন্য কেউ হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। একই সঙ্গে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা। এই দুই কাজের কোনো একটিকে বাদ দিলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

সকল অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। রাজনৈতিক হত্যার বিচার হতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হতে হবে। দুর্নীতির বিচার হতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচারও হতে হবে। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। প্রতিশোধ নতুন অন্যায় তৈরি করে। বিচার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। তাই বাংলাদেশকে এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিষয় হবে না। আবার নির্দোষ মানুষও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার হবে না। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রবাসীরা দেশের এসব পরিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা হয়তো ঢাকার রাজপথে থাকেন না। কিন্তু তাদের বাড়ি আছে দেশে। জমি আছে দেশে। পরিবারের সদস্য আছে দেশে। ব্যাংক হিসাব আছে দেশে। অনেকের ব্যবসাও আছে দেশে। তাই দেশের অস্থিরতা তাদের কাছে শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সম্ভাব্য ঝুঁকি। বিদেশে বসে যখন তারা জমি দখলের অভিযোগ শোনেন, চাঁদাবাজির খবর পান, রাজনৈতিক সহিংসতার ভিডিও দেখেন কিংবা মবের হাতে মানুষ নিহত হওয়ার দৃশ্য দেখেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা প্রশ্ন করেন—আমি দেশে ফিরব কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়। কার্যকর ব্যবস্থা দিয়ে। প্রবাসী যদি জানেন তার বাড়ি নিরাপদ, জমি নিরাপদ, ব্যবসা নিরাপদ এবং বিচার পাওয়ার অধিকার নিরাপদ, তাহলে তিনি দেশে বিনিয়োগ করবেন। দেশে ফিরবেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে তিনি ঝুঁকি নেবেন না। বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে লাভের হিসাব থাকে। ঝুঁকির হিসাবও থাকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন সেই ঝুঁকির বড় অংশ।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রবাসীরা ব্যাপকভাবে সম্পত্তি বিক্রি করে সব অর্থ বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে জাতীয় প্রবণতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে উদ্বেগকে অস্বীকার করাও ঠিক নয়। কারণ বিনিয়োগের প্রথম শর্ত আস্থা। মানুষ যেখানে নিরাপদ বোধ করেন, সেখানে বিনিয়োগ করেন। যেখানে অনিশ্চয়তা দেখেন, সেখানে অপেক্ষা করেন। কখনো অন্য দেশ বেছে নেন। তাই প্রবাসীদের উদ্বেগকে গুজব বলে উড়িয়ে না দিয়ে তথ্যভিত্তিকভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই হবে দায়িত্বশীল পথ।

বাংলাদেশের জন্য প্রবাসীরা একটি বিশাল সম্ভাবনা। তারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না। তারা দক্ষতা নিয়ে আসেন। বিদেশি বাজার সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসেন। ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিয়ে আসেন। প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। অনেকের হাতে বিনিয়োগের সক্ষমতাও আছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলে শুধু অর্থনীতি নয়, জ্ঞান ও দক্ষতার বাজারও সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু তার জন্য প্রবাসীকে শুধু ‘রেমিট্যান্সদাতা’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তাকে দেশের অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

এই কারণে প্রবাসীদের জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। একজন প্রবাসী বিদেশে বসেই তার জমির তথ্য দেখতে পারবেন। দলিলের অবস্থা জানতে পারবেন। কর পরিশোধ করতে পারবেন। অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগের অগ্রগতি দেখতে পারবেন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করতে পারবেন। ভূমি, সম্পত্তি, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সেবাকে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ব্যবস্থার মধ্যে আনা যেতে পারে। এতে সময় কমবে। হয়রানি কমবে। মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগও কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রবাসীর রাষ্ট্রের ওপর আস্থা বাড়বে।

প্রবাসীদের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থা নিয়েও ভাবা যেতে পারে। তবে সেটি আইনের বাইরে কোনো ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রতিকার। একজন প্রবাসী যেন বছরের পর বছর একটি মামলার পেছনে ছুটতে বাধ্য না হন। বিদেশে বসে তাকে যেন বারবার বাংলাদেশে আসতে না হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুনানি, নথি যাচাই এবং মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে শুধু প্রবাসীর উপকার হবে না। রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপরও মানুষের আস্থা বাড়বে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যতের আরেকটি বড় প্রশ্ন তরুণ প্রজন্মকে ঘিরে। তরুণরা একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আবার ভুল পথে গেলে তারাই বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। মাদক, গ্যাং সংস্কৃতি, অস্ত্র, অনলাইন উসকানি এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের অপরাধী সংস্কৃতি নিয়ে বিশ্বের অনেক শহরই উদ্বিগ্ন। নিউইয়র্কও তার বাইরে নয়। নিউইয়র্ক পুলিশের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরের গুলিবর্ষণের ঘটনায় ভিকটিমদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই বছরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে ছিল ১৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগের। তবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ পরিবার কঠোর পরিশ্রমী। তারা ব্যবসা করছেন। পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছেন। সন্তানদের শিক্ষিত করছেন। সমাজে অবদান রাখছেন। কয়েকজন তরুণের অপরাধ দিয়ে পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে বিচার করা অন্যায়। বরং যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের শুধু শাস্তির ভয় দেখালে হবে না। তাদের সামনে বিকল্প ভবিষ্যৎও তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মেন্টরশিপ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। একজন তরুণের হাতে স্বপ্ন থাকলে অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব কমে।

সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে এক ব্যাংককর্মী এলোমেলো ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও শহরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনাটি ভয়াবহ। কিন্তু এর সঙ্গে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। অপরাধীর পরিচয় অপরাধীর। কোনো জাতি, ভাষা বা অভিবাসী সম্প্রদায়ের নয়। প্রমাণ ছাড়া কোনো সম্প্রদায়ের ওপর অপরাধের দায় চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রকৃত অপরাধকে আড়াল করাও ভুল। দায়িত্বশীল সমাজকে দুটো বিষয়ই একসঙ্গে বুঝতে হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো রাজনৈতিক দলের সব মানুষ খারাপ নয়। কোনো দলের সব মানুষ ভালোও নয়। অপরাধী হলে তার বিচার হবে। নির্দোষ হলে তার অধিকার থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বহুদিনের। সরকার বদলালে অনেক সময় প্রশাসনের আচরণ বদলে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পড়ে। এভাবে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে। পুলিশ কোনো দলের বাহিনী নয়। প্রশাসন কোনো দলের সম্পত্তি নয়। আদালত কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের জায়গা নয়। রাষ্ট্র সবার—এই কথাটি কাগজে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও তাই অনেক। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। মানুষ পরিবর্তনের ফল দেখতে চায়। তারা নিরাপত্তা চায়। ন্যায়বিচার চায়। স্থিতিশীলতা চায়। কর্মসংস্থান চায়। বিনিয়োগের পরিবেশ চায়। প্রবাসীর প্রত্যাশাও একই। তারা এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে সরকার বদলাবে। কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা বদলাবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে। কিন্তু আইনের শাসন বদলাবে না।

জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন এখানেই। জাতীয় ঐকমত্য মানে সবাই একই কথা বলবে না। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবেই। বিতর্ক থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিরোধী দলের আন্দোলন থাকবে। কিন্তু কিছু বিষয়ে ঐকমত্য জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন রাখতে হবে। সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রাখতে হবে। এসব কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এগুলো রাষ্ট্রের ভিত্তি।

প্রবাসীদের নিয়েও একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি প্রয়োজন। প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। তাদের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে। তাদের বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। বিদেশে তারা যে প্রযুক্তি দেখেছেন, তা দেশে কাজে লাগাতে পারেন। যে ব্যবস্থাপনা শিখেছেন, তা দেশে প্রয়োগ করতে পারেন। যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু তার জন্য দরকার নিরাপদ পরিবেশ। দরকার স্বচ্ছ প্রশাসন। দরকার দ্রুত বিচার। দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সবচেয়ে বেশি দরকার আস্থা।

আস্থা ছাড়া বিনিয়োগ হয় না। আস্থা ছাড়া প্রত্যাবর্তনও হয় না। একজন প্রবাসীর সবচেয়ে বড় ভয় শুধু অর্থ হারানো নয়। তার ভয় হলো রাষ্ট্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়া। সে যদি জানে তার পাশে আইন আছে, তাহলে সে ঝুঁকি নেবে। সে যদি জানে আদালত নিরপেক্ষ, তাহলে সে বিনিয়োগ করবে। সে যদি জানে তার বাড়ি নিরাপদ, তাহলে সে দেশে ফিরবে। সে যদি জানে তার সন্তান নিরাপদ, তাহলে সে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে। এই আস্থাটুকু বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রবাসীরা দেশের কাছে খুব বেশি কিছু চান না। তারা নিরাপদ একটি দেশ চান। সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান। নিজেদের সম্পদ নিরাপদ রাখতে চান। ন্যায়বিচার চান। সবচেয়ে বেশি চান ফিরে যাওয়ার একটি নিশ্চয়তা। জীবনের শেষ প্রান্তে মানুষ সাধারণত শেকড়ের কাছেই ফিরতে চায়। একজন প্রবাসীও তার ব্যতিক্রম নন। সে হয়তো নিউইয়র্কে থাকে। লন্ডনে থাকে। টরন্টো, দুবাই, সিডনি কিংবা রোমে থাকে। কিন্তু তার ভেতরে বাংলাদেশ থাকে। তার স্মৃতিতে বাংলাদেশ থাকে। তার ভাষায় বাংলাদেশ থাকে। তার খাবারে বাংলাদেশ থাকে। তার সন্তানের গল্পেও বাংলাদেশ থাকে।

তাই প্রবাসীর দেশে ফেরার স্বপ্নকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় সম্পদ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে পারে, সে রাষ্ট্র শুধু অর্থ পায় না। সে পায় দক্ষতা। পায় অভিজ্ঞতা। পায় বিনিয়োগ। পায় নতুন চিন্তা। পায় নতুন সম্ভাবনা। আর যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকের আস্থা হারায়, সে শুধু একজন মানুষকে হারায় না। সে হারায় একটি সম্ভাবনাকে। এই সত্যটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি এমন একটি দেশ তৈরি করব, যেখানে মানুষ ভয় নিয়ে থাকবে? নাকি এমন একটি দেশ তৈরি করব, যেখানে মানুষ আস্থা নিয়ে ফিরবে? আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে বিচার রাস্তায় হবে? নাকি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে বিচার হবে আদালতে? আমরা কি এমন সমাজ চাই, যেখানে তরুণের হাতে অস্ত্র থাকবে? নাকি এমন সমাজ চাই, যেখানে তার হাতে বই থাকবে? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রবাসী শুধু টাকা পাঠাবেন? নাকি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একদিন তিনি নিজেও ফিরে আসবেন?

উত্তরটি আমাদেরই দিতে হবে। কারণ প্রবাসী শুধু দেশের অর্থনীতির অংশ নন। তিনি দেশের স্মৃতির অংশ। তিনি দেশের সম্ভাবনার অংশ। তার পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু তার আস্থা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। রেমিট্যান্স ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসে। আস্থা আসে মানুষের হৃদয় থেকে। এই দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টির মূল্য আরও বেশি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাজ এখন শুধু রেমিট্যান্স বাড়ানো নয়। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর করা। প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে আনা। রাজনীতিকে সহনশীল করা। রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ করা। সমাজকে মানবিক করা।

তবেই প্রবাসী আবার স্বপ্ন দেখবেন। একদিন হয়তো তার সব কাজ শেষ হবে। বিমানবন্দরে নেমে তিনি আর তাড়াহুড়ো করে বিদেশের জীবনে ফিরে যাবেন না। তিনি গ্রামের পথে যাবেন। পুরোনো বাড়ির দরজা খুলবেন। উঠানে দাঁড়াবেন। শীতের নরম রোদে বসবেন। চারপাশে তাকাবেন। বহু বছরের স্মৃতি ফিরে আসবে। হয়তো ধীরে ধীরে বলবেন, ‘এটাই আমার দেশ। এতদিন পর আমি আবার ফিরে এলাম।’ 

বাংলাদেশকে সেই ফিরে আসার দেশ হতে হবে। ভয় থেকে পালিয়ে যাওয়ার দেশ নয়। আস্থায় ফিরে আসার দেশ। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত তার শেকড়ের কাছেই ফিরতে চায়। আমাদের কাজ শুধু সেই শেকড়টুকু নিরাপদ রাখা।

-    লেখক সাংবাদিক, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক।