জামান সরকার, হেলসিঙ্কি থেকে//

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পরভো (Porvoo) শহরে এসে মনে হলো যেন কয়েক শতাব্দী পেছনে চলে গেছি। আধুনিক ফিনল্যান্ডের ব্যস্ত নগরজীবনের বাইরে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল এই শহর। দেশটির দ্বিতীয় প্রাচীনতম শহর হিসেবে পরিচিত পরভো শুধু ফিনল্যান্ডেরই নয়, পুরো নর্ডিক অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য।

সম্প্রতি শহরটি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। শহরে প্রবেশের পরই চোখে পড়ে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত লাল রঙের কাঠের গুদামঘরগুলো। কয়েকশ বছর আগে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত এসব ভবন আজ পোরভোর পরিচয় বহন করছে। পর্যটকদের ক্যামেরায় সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে এই দৃশ্য।

রভোর পুরনো শহর বা ‘ওল্ড টাউন’-এ হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো যেন কোনো রূপকথার শহরে প্রবেশ করেছি। সরু পাথরের রাস্তা, শত শত বছরের পুরনো কাঠের বাড়ি, ছোট ছোট ক্যাফে, শিল্পকর্মের দোকান এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য পুরো এলাকাকে অন্যরকম সৌন্দর্য দিয়েছে। শহরের প্রতিটি গলি যেন ইতিহাসের এক একটি অধ্যায়।

শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পরভো ক্যাথেড্রাল। ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত এই গির্জাটি ফিনল্যান্ডের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো শহর এবং নদীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এখানে আসা পর্যটকদের অনেকেই কিছু সময় নীরবে বসে শহরের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করেন।

পরভো নদীর তীরও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। গ্রীষ্মকালে নদীর পাশে হাঁটা, নৌভ্রমণ কিংবা খোলা আকাশের নিচে বসে কফি পান করার আনন্দই আলাদা। নদীর দুই পাড়ে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকে পুরো এলাকা।

শহরটি শুধু ইতিহাসের জন্য নয়, শিল্প ও সংস্কৃতির জন্যও সুপরিচিত। বিখ্যাত ফিনিশ কবি জোহান লুডভিগ রুনেবার্গের স্মৃতি বহন করছে এই শহর। তাঁর বাড়ি বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি ও হস্তশিল্পের দোকানে স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

পরভোর আরেকটি আকর্ষণ হলো এর ক্যাফে সংস্কৃতি। শহরের ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে স্থানীয় কফি, পেস্ট্রি ও ঐতিহ্যবাহী ফিনিশ খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পুরনো শহরের পরিবেশে বসে এক কাপ গরম কফি যেন ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশির মতো আমিও বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে পরভোকে আলাদা করে মনে রাখার কারণ হলো এর প্রশান্ত পরিবেশ, ঐতিহাসিক আবহ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিখুঁত সমন্বয়। যারা ভ্রমণ ভালোবাসেন, বিশেষ করে ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী, তাদের জন্য পরভো অবশ্যই একটি দর্শনীয় স্থান।

হেলসিঙ্কি থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় এই শহরে। তাই ফিনল্যান্ডে আসা কোনো পর্যটকের ভ্রমণ তালিকায় পরভো থাকা উচিত। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো ইউরোপের সৌন্দর্য অনুভব করতে চাইলে পরভো হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।

পরভো শুধু একটি শহর নয়, এটি ফিনল্যান্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।