বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও ঔপন্যাসিক ড. আব্দুন নূর অর্জন করেছেন ‘৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার’। দেশের বাইরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য প্রবর্তিত এই পুরস্কারকে প্রবাসী বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রোববার (২৪ মে) সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত চারদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার মূলমঞ্চে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনে পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে ড. আব্দুন নূরের নাম ঘোষণা করা হয়। এ সময় বইমেলার মিলনায়তনে উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক ও দর্শকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

পুরস্কারের প্রবর্তক গোলাম ফারুক ভূঁইয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। এ সময় মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, “মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কারের মনোনয়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছ। পুরস্কারের উদ্যোক্তা বা বইমেলা কমিটির কেউ এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। একটি স্বতন্ত্র বিচারক প্যানেল প্রতি বছর যোগ্য সাহিত্যিক নির্বাচন করে বইমেলা কর্তৃপক্ষের কাছে চূড়ান্ত নাম জমা দেন।”

পুরস্কারের অংশ হিসেবে ড. আব্দুন নূরকে নগদ ৩ হাজার মার্কিন ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট এবং বিশেষ স্বীকৃতি স্মারক প্রদান করা হয়। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. নজরুল ইসলাম এবং পুরস্কারের প্রবর্তক গোলাম ফারুক ভূঁইয়াসহ মেলা কর্তৃপক্ষের নেতৃবৃন্দ তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেন।

গোলাম ফারুক ভূঁইয়া তাঁর বক্তৃতায় জানান চালু হওয়ার পর থেকে এ পুরষ্কার পেয়েছেন ২০১৭ সালে  শামসুজ্জামান খান, ২০১৮ সালে আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ, ২০১৯ সালে দিলারা হাশেম, ২০২০ সালে সেলিনা হোসেন, ২০২১ সালে সমরেশ মজুমদার, ২০২২ সালে গোলাম মুরশিদ, ২০২৩ সালে আসাদ চৌধুরী, ২০২৪ সালে  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ২০২৫ সালে পবিত্র সরকার এবং এবছর ২০২৬ আবদুন নূর। 

ড. আব্দুন নূর পুরস্কার প্রাপ্তির পর মঞ্চে দেওয়া তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তিনি বলেন, প্রায়ই বলা হয় নিজেদের মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয়ে সচরাচর স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করে আপ্লুত ড. আব্দুন নূর সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় জানান, এ স্বীকৃতি ও সম্মান তিনি সাদরে গ্রহণ করেছেন। এর উদ্যোক্তা ও মুক্তধারা ফাউন্ডেশনকে তিনি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আব্দুন নূর দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে কর্মরত থাকলেও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু পুরোনো। ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি নিয়মিত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে প্যাগাসাস, শূন্যবৃত্ত, বিচলিত সময়, ঢাকা শহর ঘিরে এবং চার দেয়াল—যা বাংলা সাহিত্যে তাঁকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছর ‘৩৪তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’য় ড. আব্দুন নূর ‘আজীবন সম্মাননা’ লাভ করেছিলেন। এবার একই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।

চারদিনব্যাপী বইমেলার তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মুক্তধারা স্মারক বক্তব্য’। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। বক্তব্যে তিনি বলেন, “গত ৩৫ বছর ধরে নিউইয়র্কের এই বইমেলা প্রবাসী বাঙালিদের একই ছাতার নিচে একত্রিত করে রেখেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে আমাদের আরও বেশি ভালো বাংলা বই ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম এবং আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্য পৌঁছে যায়।”

৩৫তম বইমেলার সাথে সংশ্লিষ্ট কমিটির লোকজনকে নিয়ে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং মেলার আহ্বায়ক পুরষ্কারপ্রাপ্ত ডঃ আব্দুন নুরকে মঞ্চে অভিনন্দন জানান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের উপস্থাপনায় ছিলেন খ্যাতিনাম সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার।  

প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, এবারের আয়োজনও তার উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে উঠেছে।