নিউইয়র্কের কুইন্স, ব্রঙ্কস ও আশপাশের এলাকায় গত কয়েক বছরে হঠাৎ করেই চোখে পড়ছে অসংখ্য থেরাপি সেন্টার। বাইরে থেকে এগুলোকে দেখলে মনে হয়, শারীরিক অক্ষমতা, স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা কিংবা বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফেডারেল প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থাগুলোর অভিযোগ—এই সেন্টারের একটি অংশ চিকিৎসাসেবার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ইন্স্যুরেন্স জালিয়াতির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড সুবিধাভোগী বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষদের টার্গেট করে নামমাত্র বা আদৌ না দেওয়া সেবার বিপরীতে বিপুল অঙ্কের বিল পাঠানো হচ্ছে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর কাছে। অনেক ভুক্তভোগী জানতেই পারেন না, তাদের নাম ব্যবহার করে কীভাবে হাজার হাজার ডলারের দাবি তোলা হচ্ছে।

যেভাবে চলছে প্রতারণা

ফেডারেল তদন্তে উঠে এসেছে, নিউইয়র্কের কিছু থেরাপি ক্লিনিক নিয়মিতভাবে অপ্রয়োজনীয় সেবা দেখিয়ে বিল করছে, কোথাও লাইসেন্সবিহীন কর্মীদের দিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছে, আবার কোথাও রোগী উপস্থিত না থাকলেও কাগজে-কলমে থেরাপি সেশন সম্পন্ন দেখানো হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য একটাই—সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি থেকে সর্বোচ্চ অর্থ আদায়।

জানা গেছে, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড মূলত বয়স্ক, অক্ষম ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য চালু করা সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় থেরাপি সেবার বিল তুলনামূলকভাবে সহজে অনুমোদিত হয়। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারণাকারীরা। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের পুরোপুরি বোঝানো হয় না তাদের নামে কী ধরনের দাবি জমা দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেকে বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেন না।

কুইন্সের ওজন পার্ক এলাকায় বসবাসকারী এক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, হাঁটুর ব্যথার কারণে তিনি একটি থেরাপি সেন্টারে গিয়েছিলেন। কয়েক দিন যাওয়ার পর আর যাননি। পরে জানতে পারেন, তার নামে কয়েক মাস ধরে নিয়মিত থেরাপি সেশনের বিল মেডিকেয়ারে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম ওরা কাগজপত্র ঠিক করছে। পরে বুঝলাম, আমার নাম ব্যবহার করে টাকা তোলা হচ্ছে।

এই ধরনের অভিযোগ শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মতে, এটি একটি পরিকল্পিত ব্যবসায়িক মডেল। থেরাপি সেন্টারগুলো প্রথমে স্থানীয়ভাবে দালাল বা পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে। অনেক সময় বিনা খরচে যাতায়াত, খাবার বা নগদ প্রণোদনার প্রলোভনও দেখানো হয়। এরপর রোগীর ইন্সুরেন্স তথ্য ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে বিল জমা দেওয়া হয়।

নতুন নয় এমন ঘটনা, যা আছে আগের মামলায়

নিউইয়র্কে স্বাস্থ্যসেবা প্রতারণার ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে থেরাপি সেন্টারকেন্দ্রিক প্রতারণা যেভাবে বেড়েছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে ফিজিক্যাল থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরেই অভিযোগের সংখ্যা বেশি।

২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একাধিক মামলার ঘোষণা দেয়। যেখানে দুই চিকিৎসক, দুই লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট, একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, একজন ফার্মাসিস্ট এবং চারজন ফার্মেসির মালিকসহ মোট ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তারা সম্মিলিতভাবে ১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি ভুয়া বিল মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডে জমা দিয়েছিলেন।

এই মামলাগুলো ছিল দেশব্যাপী পরিচালিত ‘মেডিকেয়ার ফ্রড স্ট্রাইক ফোর্স’র অংশ। যেখানে সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের জাল দাবির সঙ্গে যুক্ত ৩শ’র বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিউইয়র্কের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা প্রসিকিউটরদের মতে, এসব অভিযুক্তের অনেকেই ছিলেন স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী, যারা নিজেদের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের ক্ষতি করেছেন।

ওই সময় ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের ভারপ্রাপ্ত ইউএস অ্যাটর্নি সেথ ডি. ডুচার্মে বলেন, অভিযুক্তদের অনেকেই স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী হয়েও এমন অর্থ চুরি করেছেন। যা সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল। তার ভাষায়, এই ধরনের অপরাধ শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেও ভেঙে দেয়।

তদন্তে যে চিত্র উঠে আসে, তা আরও উদ্বেগজনক। কুইন্সে পরিচালিত একাধিক থেরাপি ক্লিনিকে রোগী না দেখেই প্রেসক্রিপশন দেওয়া, কারাগারে থাকা ব্যক্তির নামেও ওষুধ লিখে দেওয়া এবং কখনো বিদেশে অবস্থান করেও নিউইয়র্কে সেবা দেওয়া হয়েছে—এমন ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা হয়। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শুধু একটি টেলিমেডিসিন-সম্পর্কিত প্রতারণায় ১৩ লাখ ডলারের বেশি বিল মেডিকেয়ারে জমা দেওয়া হয়েছিল।

ফিজিক্যাল থেরাপি সেন্টারগুলোতে প্রতারণার ধরন ছিল আরও সুপরিকল্পিত। ফেডারেল অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কিছু ক্লিনিকে রোগীদের নগদ অর্থ বা নানা সুবিধার লোভ দেখিয়ে হাজিরা খাতায় সই করানো হতো। কখনো তারা সামান্য সময় ক্লিনিকে বসে থাকত, কখনো আদৌ আসত না। অথচ কাগজে-কলমে দেখানো হতো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেরাপি সেশন সম্পন্ন হয়েছে। এসব ভুয়া নথির ওপর ভিত্তি করেই মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড থেকে অর্থ তোলা হতো।

এ ধরনের প্রতারণার আরেকটি বড় দিক হলো ‘কিকব্যাক’ সংস্কৃতি। তদন্ত সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু থেরাপি সেন্টার নিয়মিতভাবে রোগীদের নগদ অর্থ দিত, যাতে তারা তাদের ইন্স্যুরেন্স তথ্য ব্যবহার করতে দেয়। এতে রোগী তাৎক্ষণিক কিছু টাকা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন, কারণ তার নামে অতিরিক্ত বা ভুয়া চিকিৎসা ইতিহাস তৈরি হতো।

এর আগে, ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর নিউইয়র্কে আরও একটি আলোচিত মামলা সামনে আসে। সে সময় ফেডারেল অভিযোগে বলা হয়,  দুজন সরকারি স্কুলের শিক্ষকসহ আটজন থেরাপিস্ট মেডিকেইড থেকে ৬ লাখ ডলারের বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা উন্নয়নজনিত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন শিশুদের জন্য থেরাপি সেবা দেওয়ার কথা দেখিয়ে বিল করতেন। অথচ বাস্তবে সেই সেবাগুলো কখনোই দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে থেরাপিস্টরা নিউইয়র্কে না থেকেও সেবা দেওয়ার দাবি করেছিলেন; এমনকি একজন অভিযুক্ত একই সময়ে বিদেশে ছুটিতে থাকা অবস্থায় থেরাপি সেশনের বিল জমা দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রতারকদের কর্মকাণ্ড ভোগাচ্ছে অভিবাসী কমিউনিটিকে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতারণা অভিবাসী কমিউনিটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনেক প্রবীণ অভিবাসী ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও অজ্ঞতার কারণে বুঝতেই পারেন না, তাদের নামে কীভাবে ভুয়া বিল জমা দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা অনীহা বোধ করেন।

এছাড়া সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারি সহায়তা নেওয়া বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছেন। যেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাম উঠে এসেছে। পরে এসব অনেক দেশের ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। যা অভিবাসী কমিউনিটির জন্য উদ্বেগজনক।

এমন পরিস্থিতিতে ফেডারেল ও রাজ্য সরকার থেরাপি সেবায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অডিট, সন্দেহজনক বিলিং প্যাটার্ন শনাক্তকরণ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে থেরাপি সেন্টারগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন, ইন্সুরেন্স কোম্পানি ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন। অন্যথায়, থেরাপি সেন্টারের নামে সংগঠিত এই প্রতারণা আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে—যার খেসারত দিতে হবে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেই।