যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি।
খবর প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:১১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন এলাকায় এই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে বলেন, গ্যাস থেকে শুরু করে মুদিপণ্য—সবকিছুর দাম বাড়ছে। এ কারণে তিনি রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়।
নির্বাচনী জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তারা বা তাদের পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ ইরান যুদ্ধ।
এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপরও। যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক মাগা গোষ্ঠীর অনেকের কাছেও এটি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প আর কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এক জরিপে ৬৩ শতাংশ জনগণ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্পও পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের প্রভাবের কথা স্বীকার করেন। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
ডেমোক্র্যাটদের কার্যকর নির্বাচনী প্রচারণা
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে প্রার্থীদের প্রচারণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর মতো সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে সামনে রেখেছিলেন।
টেক্সাসের সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কথা তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন পান। সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, মিশিগানে জয়ী আব্দুল এল-সায়েদ রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারণার প্রধান বিষয় করেন। রাজ্যটিতে ট্রাম্প দুবার জয়ী হলেও ৩৯ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতার সহজ জয় তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। এমনকি ট্রাম্পও ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারণার প্রশংসা করে বলেছেন, তারা ভালো কাজ করেছেন। অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী ভোটারদের প্রধান উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সমালোচিত হয়েছেন।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা। মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের মতো ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিজেই। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে সমর্থন করা কয়েকটি রাজ্যে এবার রিপাবলিকান প্রার্থীরা চাপে পড়েন।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে ভোট দিতে আহ্বান জানান, যেন ব্যালটে তার নিজের নামই রয়েছে। তবে এতে খুব একটা লাভ হয়নি। বরং রিপাবলিকানদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে ট্রাম্পকে রাখার সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্পের আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ ভোটার। অথচ নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ নির্বাচনী ভাষণে তিনি নিজের বাসভবনের পেছনের রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কারকাজ নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন।
হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন করেছিল। তাদের সমর্থন ট্রাম্পের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা গেছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের হিস্পানিক-অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। অভিবাসন নীতি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বেড়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন বেড়েছে।