মশিউর রহমান মজুমদার প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

মশিউর রহমান: ‘কিশোর গ্যাং’—শব্দ দুটি এখন আর শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন কিশোরদের আড্ডার পরিচয় নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের সঙ্গে এই শব্দটির যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। ছিনতাই থেকে চাঁদাবাজি, মাদক থেকে হত্যাকাণ্ড—বিভিন্ন অপরাধে কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততার খবর সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে—কিশোরদের হাতে অস্ত্র উঠছে কেন?
একটি কিশোর সাধারণত জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। পরিবার, পরিবেশ, বন্ধুমহল, সামাজিক বাস্তবতা এবং নানা ধরনের প্রভাব তার আচরণকে বদলে দিতে পারে। শুরুতে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি কিংবা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা হয়তো নিরীহ। কিন্তু সেই দলের মধ্যে যদি অপরাধী মানসিকতা, মাদক কিংবা অস্ত্র ঢুকে পড়ে, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
কিশোরদের একটি অংশ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে অপরাধীসুলভ আচরণকে ‘সাহস’ বা ‘হিরোইজম’ হিসেবে দেখার প্রবণতায় আক্রান্ত হয়। ভয় দেখানো, অস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে মারধর কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার—এসব আচরণ যখন বন্ধুমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তখন অপরাধের সীমা ক্রমেই বড় হতে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাদক। মাদকের বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যগত বা ব্যক্তিগত সমস্যা তৈরি করে না; এটি অপরাধের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করে। মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং স্থানীয় আধিপত্যের নানা কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করা হলে তারা খুব দ্রুত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিশোর অপরাধে জড়ালেই তাকে একমাত্র দায়ী ধরে নিলে সমস্যার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তার পেছনে কারা আছে, কে তাকে মাদক দিচ্ছে, কে অস্ত্র দিচ্ছে, কে অপরাধে উৎসাহিত করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কিশোরকে ব্যবহার করে যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী নিজের স্বার্থ হাসিল করে, তাহলে সেই পৃষ্ঠপোষককে শনাক্ত করাই হওয়া উচিত তদন্তের অন্যতম অগ্রাধিকার।
পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, তার বন্ধুমহল সম্পর্কে ধারণা রাখা, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা—এসবকে শুধু শাসনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন বিশ্বাস ও যোগাযোগের সম্পর্ক তৈরি করা। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কেবল ফলাফল ও পরীক্ষার বাইরে শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে।
তবে প্রতিরোধের পাশাপাশি আইন প্রয়োগও সমান জরুরি। অপরাধ করলে বয়সের আড়ালে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। আবার সংশোধনের সুযোগ থাকা কিশোরদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। কারণ একজন কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একটি জীবনকে রক্ষা করা নয়; ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য অপরাধকেও প্রতিরোধ করা।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় নেতৃত্ব—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত একটি সমন্বিত সামাজিক চ্যালেঞ্জ। কিশোরদের হাতে অস্ত্র ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রটি তাদের হাতে পৌঁছানোর পথটিও বন্ধ করতে হবে।
আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক। তাকে অপরাধের হাতিয়ার বানানো হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ। তাই কিশোরদের ভয় পাওয়ার আগে তাদের কেন এই পথে টেনে নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
- সাংবাদিক, ব্রন্স, নিউ ইয়র্ক।