উত্তর আফ্রিকার উপকূলে স্পেনের বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় সরকারের ভূমিকার প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
খবর প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

উত্তর আফ্রিকার উপকূলে স্পেনের বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় সরকারের ভূমিকার প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, সেউতার বাসিন্দাদের সংকটের মধ্যে ফেলে রেখেছে সানচেজ সরকার। তবে সরকারের দাবি, ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অভিবাসী সংকটকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে অন্তত ৭২ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেন। তাদের বেশির ভাগকেই পরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। পাশাপাশি স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের পুনর্বণ্টনের দাবিও উঠেছে। বুধবার স্পেনের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। এসব শহরের অনেকগুলোতে বিরোধী রক্ষণশীল দল পিপি ও কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি সরকার পরিচালনা করছে অথবা দল দুটির উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে।
সেউতার ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষক ডেভিড হার্নান্দেজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না এবং তা অনেক দেরিতে এসেছে। তার মতে, সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারেনি। তিনি বলেন, সেউতার বাসিন্দারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নন এবং তাদের সীমান্তের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনায় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীদের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী ‘সম্পূর্ণ উদাসীনতা’ দেখিয়েছিল। স্পেনের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সানচেজ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরো বেড়েছে।
জাতীয় পুলিশ বাহিনীর জাতীয় অভিবাসন ও সীমান্ত কেন্দ্রের পক্ষ থেকে স্পেনের জাতীয় আদালতে ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেউতার সীমান্তের কাছে মরক্কোর পুলিশের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় স্পষ্টভাবে কম ছিল। সীমান্ত পার হওয়া অভিবাসীদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের অনেকেই বলেছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সময় মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কার্যকর কোনো বাধা দেয়নি এবং তাদের আচরণ ছিল নিষ্ক্রিয়। তবে পুলিশের প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়নি যে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে সেউতায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পেছনে মরক্কো সরকার বা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীই ছিল।
এর কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জোর দিয়ে বলেছিলেন, সেউতায় অভিবাসীদের প্রবেশের ঘটনায় মরক্কোকে দায়ী করা ঠিক হবে না। সানচেজের মতে, মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত পার হওয়ার জন্য উৎসাহিত হয়েছেন। তবে মরক্কোও এ ঘটনায় নিজেদের কোনো ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির দাবি, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনা তারা আয়োজন করেনি এবং এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেউতায় অভিবাসীদের ঢলের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত পার হওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেনের তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট মালদিতা।
ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সেউতায় প্রবেশের ঘটনা শুরুর আগেই মরক্কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব বার্তায় মরক্কো ও সেউতার মধ্যকার সীমান্তের বেড়াকে নিরাপদ এবং সহজে পার হওয়া সম্ভব বলে দেখানো হয়েছিল। জুনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর এসব বার্তা আরও ছড়িয়ে পড়ে বলে জানানো হয়েছে। সেউতার মেয়রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের বেড়া এড়িয়ে সাঁতরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন। এদিকে সেউতা ও পাশের আরেক স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে মরক্কো।
এই দুই শহরকে ঘিরে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক টানাপড়েন রয়েছে। ফলে সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। বর্তমানে সেউতায় কয়েক হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন। তাদের একটি অংশ অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে থাকলেও অনেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপ, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে সানচেজ সরকার।