NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬ | ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
সড়ক-বাঁধ সুরক্ষায় বিন্না ঘাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ইরান চান ট্রাম্প, জানালেন কুশনার অবশেষে বিয়ের গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুললেন পূজা চেরী ভারতীয় ধনকুবেরের দল ইংল্যান্ডের দ্য হানড্রেডে চ্যাম্পিয়ন আশা ভোঁসলের স্মরণে এ আর রহমানের বিশেষ উদ্যোগ, সঙ্গে শাহরুখ U.S. Business Delegation in Dhaka Signals Growing Investment Interest in Bangladesh বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুঁজছে মার্কিন শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন গতি, অর্থনীতি ও কৌশলগত অংশীদারত্বে ওয়াশিংটনের আগ্রহ যারা দেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের নজরদারিতে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষের পথে যুদ্ধবিরতি, ফের কি সংঘাতে জড়াবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান?
Logo
logo

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন গতি, অর্থনীতি ও কৌশলগত অংশীদারত্বে ওয়াশিংটনের আগ্রহ


Shibbir Ahmed   প্রকাশিত:  ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন গতি, অর্থনীতি ও কৌশলগত অংশীদারত্বে ওয়াশিংটনের আগ্রহ

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৌশলগত সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে দুই দেশের যোগাযোগও বাড়ছে। বিশেষ করে চলতি বছরের বাণিজ্য চুক্তি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর দুই দেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করেন। সফর শেষে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস জানায়, তাঁর সফর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরিধি ও গভীরতা তুলে ধরেছে এবং দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।

বিনিয়োগে নতুন আগ্রহ

সার্জিও গরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি বিনিয়োগ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে গর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ পরামর্শে সাম্প্রতিক পরিবর্তন আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের International Development Finance Corporation (DFC)-এর মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে U.S.-Bangladesh Business Council-এর একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্যের পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।

বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন ভিত্তি

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলতি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো দুই দেশের Agreement on Reciprocal Trade (ART)।

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বাজারে পণ্য প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পণ্য, জ্বালানি এবং কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার, রপ্তানি সুবিধা এবং মার্কিন বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়। ফলে ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তির পর গরের সফরকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতির বাইরে কৌশলগত গুরুত্ব

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

গরের সফরের সময় অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়ও আলোচনায় আসে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলোতেও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের পরিবর্তন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে কেবল চীন বা ভারতকে কেন্দ্র করে ব্যাখ্যা করা হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও নিজস্ব স্বার্থের বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে। দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও মানবিক সহযোগিতার নিজস্ব স্বার্থও এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

রোহিঙ্গা সংকটেও সহযোগিতা

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ সফরের সময় সার্জিও গর কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয়, মানবিক সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এই মানবিক সংকটে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটও একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে থেকে যাচ্ছে।

কেন বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে?

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় অর্থনীতি এবং বিপুল ভোক্তা বাজারের দেশ। একই সঙ্গে দেশটির তরুণ কর্মশক্তি এবং তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাত বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক অংশীদার এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে একটি শক্তিশালী পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে আগ্রহী, তেমনি বাংলাদেশও মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহী।

সামনে বাস্তবায়নের পরীক্ষা

তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ নেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ফেব্রুয়ারির Reciprocal Trade Agreement-এর প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগে কতটা আগ্রহ দেখায় এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে যায়—এসব বিষয় আগামী দিনের সম্পর্কের বাস্তব চিত্র নির্ধারণ করবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন শুধু পোশাক রপ্তানি বা প্রচলিত বাণিজ্যিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, মানবিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির সমন্বয়ে সম্পর্কটি আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফর এবং চলতি বছরের Reciprocal Trade Agreement সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দৃষ্টান্ত। এখন মূল বিষয় হলো, এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতি কতটা দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ নেয়।