এর বিপরীতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১৭৭ কোটি ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ৩৯২ টাকা। ২০২২-২৩ করবর্ষে এই গ্রামীণ ব্যাংকের আয় ছিল ৩৯০ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার ৬০৬ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কর দিয়েছে ১৫৫ কোটি ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯০৪ টাকা।
কয়েক বছরের করের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে ধরে নেওয়া যায় প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর গড়ে ২০০ কোটি টাকা আয়কর সরকারের কোষাগারে জমা দেয়। অন্যদিকে কর অব্যাহতি থাকার কারণে আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো ধরনের আয়কর পাবে না সরকার। সে হিসাবে, এ সময় পর্যন্ত সরকার রাজস্ব হারাবে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা। অথচ কর-জিডিপি অনুপাতের করুণ দশা থাকায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে ঋণ চায় সরকার। দাতা সংস্থাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল নতুন করে কর অব্যাহতি না দেওয়া এবং ধীরে ধীরে অব্যাহতি কমিয়ে আনা। সরকার যখন নতুন করে আবার এই সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে ভাবছে, তখন সামনে আসছে নতুন করে অব্যাহতি নেওয়ার গল্প।
কর অব্যাহতি দেওয়ার আগে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। আমাদের যে কর অব্যাহতি আছে, সেসব ভালোভাবে পুনর্বীক্ষণ করা দরকার। এ ছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হচ্ছে, এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। কর অব্যাহতির অনেক ক্ষেত্রে টাইম লিমিট থাকে না। এগুলোকে আবার রিনিউ করা হয়। তবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কোনো সেক্টরে কর অব্যাহতি একেবারে দেওয়া যাবে না, সেটাও ঠিক না।’
এবার দায় সংসদের ওপর : এর আগেই আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের অক্টোবর গ্রামীণ ব্যাংককে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা সেই গেজেটের এসআরও নং-৩৩৯-আইন/আয়কর-৪৭/২০২৪। স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা হাসিলের পর ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে অর্থ অধ্যাদেশের মাধ্যমে নতুন আইন চালু করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে বলা হয়েছে, এখন থেকে চাইলেই কোনো কর অব্যাহতি দিতে পারবে না এনবিআর। কর অব্যাহতি পেতে হলে লাগবে জাতীয় সংসদের অনুমতি।
শর্ত না মেনেও কর মাফ! : ভ্যাট অব্যাহতি পেয়েও শর্ত মানেনি গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি। শর্তে ৫০ শতাংশ ব্যাটারি ও চার্জার উৎপাদনের কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি হেঁটেছে আমদানির পথে। এর উদ্দেশ্য ছিল আমদানি কমিয়ে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। তবে এনবিআর ও বুয়েটের যৌথ তদন্ত কমিটি সরেজমিনে ব্যাটারি উৎপাদনের কোনো মেশিনারিজ নেই বলে উল্লেখ করেছে। গোপনীয় সেই প্রতিবেদন বলছে, স্মার্টফোনের ব্যাটারির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে সক্ষমতা থাকলেও তারা পিসিবিএ বা চার্জার উৎপাদন করে না।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, আড়াই শতাংশ কর কম দেওয়ার জন্যই এত সব আয়োজন। বর্তমানে মোবাইল ফোনসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ভ্যাটহার ১০ শতাংশ। তবে এসআরও সুবিধা পাওয়ায় গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য এই হার ৭.৫০ শতাংশ। বর্তমানে জিডিএল, জিটিই ও বেনকো—এই তিন নামে মোবাইল ফোনসেট উৎপাদন করছে গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন। সে কারণে আড়াই শতাংশ ভ্যাটের কারণে অনেক টাকার হেরফের হয়। তবে শর্ত লঙ্ঘন করে সুবিধা নেওয়ার পরও এ বিষয়ে নিশ্চুপ এনবিআর। কত টাকার বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি, তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই অঙ্ক কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা।
ফাঁকি এক হাজার কোটি টাকা : গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করেছে এনবিআর। ২০১১-১২ করবর্ষ থেকে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আছে। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক হাজার ৪৩ কোটি টাকা কর ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে। বিভিন্ন করবর্ষের জন্য আলাদাভাবে এই ডিমান্ড ইস্যু করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরে আপিল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আপিলের রায়েও কর ফাঁকির টাকা পরিশোধের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ। সেখানেও একই রায় বহাল থাকে। আপিল, ট্রাইব্যুনালে হেরে যাওয়ার পর হাইকোর্টে রিট করে প্রতিষ্ঠানটি। এখনো এই মামলা ঝুলে আছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
কৌশলে কর কম, ৬৬৬ কোটি মাফ : গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্ট তাদের তহবিল থেকে গ্রামীণ টেলিকমকে ঋণ দিয়েছিল। এই ঋণের বিপরীতে প্রতিবছর বড় অঙ্কের সুদ পেত গ্রামীণ কল্যাণ। আয়কর আইন অনুযায়ী, এই সুদ আয়ের ওপর নির্ধারিত হারে কর দিতে হয়। কিন্তু এই সুদ আয়কে লভ্যাংশ হিসেবে দাবি করে গ্রামীণ ব্যাংক। সে অনুযায়ী, লভ্যাংশের বিপরীতে তারা আয়কর দিয়েছে, যা সুদ আয়ের ওপর আরোপ করা করের অর্ধেক।
আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন, কাউকে ঋণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পাওয়া যায় না। ঋণ দিলে ঋণের বিপরীতে সুদ পাওয়া যায়। লভ্যাংশ পেতে গেলে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকতে হয়। তবে গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দিয়ে তার বিপরীতে পাওয়া সুদকে লভ্যাংশ হিসেবে দেখিয়ে কম কর দিয়েছে।
গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত পাঁচ করবর্ষের ৬৬৬ কোটি টাকা কর নির্ধারণের আদেশ জারি করেছিল এনবিআর। কর নির্ধারণের পর এর বিরুদ্ধে এনবিআরে আপিলে হেরে যায় গ্রামীণ কল্যাণ। আপিলের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গ্রামীণ টেলিকম যেহেতু গ্রামীণফোনের সমুদয় শেয়ার নিজ নামে ক্রয় করেছে, সে মতে গ্রামীণফোন থেকে প্রাপ্ত সমুদয় লভ্যাংশের অংশীদার হবে শুধু গ্রামীণ টেলিকম, যা গ্রামীণ টেলিকম কোনোভাবেই ডিভিডেন্ড আকারে গ্রামীণ কল্যাণকে বণ্টন করতে পারবে না। এ কারণে গ্রামীণ কল্যাণের ক্ষেত্রে আয়কর অধ্যাদেশের ৩৩ ধারায় অন্যান্য উৎসর আয় শিরোনামে আয় হিসেবে গণ্য হবে।
এরপর ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সেখানেও হেরে যায় গ্রামীণ কল্যাণ। এরপর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক দিন আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট এ বিষয়ে রিট খারিজ করে দেন।
তবে ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর আগের রায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আদালত। এই রায়ের মাধ্যমে ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে না গ্রামীণ কল্যাণকে।