জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস আজ বুধবার। সারা দেশে সরকারি সাধারণ ছুটি থাকবে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায় এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ওই বছরের আজকের দিনে (৫ আগস্ট)।
ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত রক্তাক্ত এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভ্যুত্থানের আগে ৩ আগস্ট আন্দোলনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘একদফা’ দাবি ঘোষণা করেন।
এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে জোরালোভাবে রাজপথে নামতে শুরু করেন।
৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে কারফিউ উপেক্ষা করে ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কেউ বাসে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার অনেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে রাজধানীতে প্রবেশ করেন। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। একদফার স্লোগানে মুখরিত রাজপথ ধরে আন্দোলনকারীরা গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
এ সময় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে টানা প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। সাধারণ হিসাবে তারিখটি ৫ আগস্ট হলেও অভ্যুত্থানকারীরা জুলাইয়ের রক্তস্রোত না থামা পর্যন্ত মাসটিকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত বিবেচনা করেন।
আন্দোলনের সূচনা হয় ২০২৪ সালের ৫ জুন। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি শুরু করেন। ১ জুলাই থেকে আন্দোলন আরো বিস্তৃত ও সংগঠিত রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করলেও সরকার বিষয়টিকে আদালতের এখতিয়ার বলে উল্লেখ করে।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দেশজুড়ে নতুন গতি পায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেয়। তবে এসব উদ্যোগ আন্দোলন থামাতে পারেনি; বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। আহতদের একটি বড় অংশ চোখে গুরুতর আঘাত পান, যাদের অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে শুরুতে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ এবং পরে মাহফুজ আলম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া ও নির্বাচন আয়োজনের নানা উদ্যোগ গ্রহণের পর প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।
জাতীয় কর্মসূচি
জাতীয় পর্যায়ে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সকালে দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকাসহ ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন নিশানে সাজানো হবে।
এদিন সকাল ৯টায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেলা ১১টায় রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
আরো আয়োজন
এ উপলক্ষে বিএনপি গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিশেষ আলোচনা সভা করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দল আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে গণসমাবেশ করবে।
এ ছাড়া গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স, গণফোরামসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।


