২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তীব্র রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে সারা দেশে তৈরি হয় এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। রাজধানী ঢাকার প্রতিটি কোণায় তখন সংঘাত, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। সেই উত্তাল ও বিপজ্জনক সময়ে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ের কথা না ভেবে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণ। যার এক হাতে ছিল পানির বোতল, অন্য হাতে বিস্কুটের প্যাকেট, আর কণ্ঠে ছিল এক মানবিক আহ্বান ‘পানি লাগবে পানি’।

 

রাজধানীর উত্তরা আজমপুর এলাকার সেই সাহসী তরুণ ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করার সময়ই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে হাতে পানির বোতল নিয়ে ছুটে চলার সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা কোটি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়।

মুগ্ধের এই অকাল ও নির্মম মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা হয়ে থাকেনি। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন সাহস, সহমর্মিতা ও অনন্য মানবিকতার প্রতীক। বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অসংখ্য আত্মত্যাগের গল্পের মাঝে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ নামটি আজ অমর অনুপ্রেরণা।

 

স্মৃতির পাতায় ১৮ জুলাই

চারদিকে সংঘাত আর উত্তেজনার মাঝেও উত্তরা আজমপুর এলাকায় মানুষের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। হাতে পানির বোতল ও বিস্কুট নিয়ে তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের মাঝে ঘুরে ঘুরে তা বিতরণ করছিলেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরই আজমপুর সড়কে গুলিবিদ্ধ হন মুগ্ধ। 

 

 

তার বন্ধু নাইমুর রহমান আশিক জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সবাই যখন দৌড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখেন মুগ্ধ মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন। তখনও মুগ্ধের হাতে ছিল বিস্কুট ও পানির বোতলের পলিথিন।

সঙ্গে থাকা তার আরেক বন্ধু জাকিরুল ইসলাম জানান, গুলিটি মুগ্ধের কপালে লেগে ডান কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায়ও তার পাশে ছিল পানির বোতলের কেস। বন্ধুরা দ্রুত উদ্ধার করে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মুগ্ধকে মৃত ঘোষণা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মুগ্ধকে বলতে শোনা যায়, ‘এই পানি লাগবে পানি, পানি লাগবে পানি’। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই আকুল আহ্বানই পরবর্তী সময়ে মানুষের বুকে তার শেষ স্মৃতি হয়ে দাগ কেটে যায়।

যে মানুষটি ছিলেন সবার প্রিয়

১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তার গ্রামের বাড়ি  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইলে। বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং মা শাহানা চৌধুরীর তিন সন্তানের মধ্যে মুগ্ধ ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত এবং যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই মুগ্ধ ছিলেন অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও পরোপকারী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুণটি ছিল তার সহজাত।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মুগ্ধ বিইউপি-তে এমবিএ-তে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়েও তিনি ছিলেন সফল। মেধাবী এই তরুণ যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ স্কাউটসের সঙ্গেও। ২০১৯ সালে বনানীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘জাতীয় পরিষেবা পুরস্কার’। 

 

দুই বছরেও বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, ক্ষুব্ধ পরিবার

মুগ্ধ নিহত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে রয়েছে। এতে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে তার পরিবার। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে তারা কেবল আশ্বাসই শুনেছেন, কিন্তু বিচার কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেননি। এত বড় একটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হবে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, তৎকালীন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসান, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, উত্তরা বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) কাজী আশরাফুল আজীম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মির্জা সালাহউদ্দিন, এডিসি মো. তোহিদুল ইসলাম

মুগ্ধের যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত বিচার পাইনি। শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল হত্যার দ্রুত বিচার। কিন্তু দুই বছর পরও বিচার কার্যক্রম প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘যে বাংলাদেশের জন্য মুগ্ধ প্রাণ দিল, সেই বাংলাদেশ এখনো আমরা দেখিনি। বিচারহীনতা শুধু আমাদের পরিবারের নয়, শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গেও এক ধরনের বেইমানি’।

স্নিগ্ধ আরও বলেন, ‘আমাদের মা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রতিটি উৎসব এখন পরিবারের কাছে শোকের দিন। মুগ্ধের অনুপস্থিতি প্রতিনিয়ত অনুভব করেন’।

 

মুগ্ধ হত্যার পর সরকারের পক্ষ থেকে গণভবনে যাওয়ার প্রস্তাব এলেও পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করেছিল, এমন দাবি করে স্নিগ্ধ বলেন, ‘গণভবনে যেতে বলা হয়েছিল, ব্ল্যাংক চেকও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকার বিনিময়ে ভাইয়ের রক্ত বিক্রি করিনি।’

 

মুগ্ধসহ ১১ জন হত্যা : ট্রাইব্যুনালে ২৬ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় উত্তরায় সংঘটিত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের বিবরণ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। বিইউপির শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, তৎকালীন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসান, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, উত্তরা বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) কাজী আশরাফুল আজীম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মির্জা সালাহউদ্দিন, এডিসি মো. তোহিদুল ইসলাম।

 

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীরা দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পরিকল্পিত ও প্রাণঘাতী হামলা চালায়। এর অংশ হিসেবে ১৭ ও ১৮ জুলাই ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চাইনিজ রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের অধীনস্থ সদস্যদের এই অপরাধ সংঘটন থেকে বিরত রাখেননি এবং পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যবস্থাও নেননি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই সকাল থেকেই উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানা এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য এপিসি ও ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। একই সময়ে সেখানে জড়ো হন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরাও। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, গ্যাস শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। আন্দোলনকারীরা অলিগলিতে আশ্রয় নিলেও তাদের ধাওয়া করে গুলি করা হয়।

ঠিক ওই সময়ে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণিতে ‘প্রিয় প্রাঙ্গণ’ ভবনের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মুগ্ধ। তিনি তখন আহতদের হাসপাতালে নিতে সাহায্য করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন। পরে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৮ জুলাইয়ের একই সহিংসতায় জাহিদুজ্জামান তানভীন, ডা. সজিব সরকার, শাকিল হোসেন, শেখ ফাহমিন জাফর, সাব্বির হোসেন এবং উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয় নিহত হন। এ ছাড়া মমিনুল ইসলাম মারজান, মোস্তাহিদ হোসেন ভূঁইয়া সামি, মেহেদী হাসান, রাকিব উদ্দীন ও আলী হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।

 

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয় একটি এপিসির পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। পরে তার মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে প্রথমে উত্তরা পূর্ব থানার নিচতলার পাম্পকক্ষে রাখা হয়। গভীর রাতে গাড়িতে করে উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। দুদিন পর, ২০ জুলাই গাজীপুরের টঙ্গীর মরকুন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে, ১৯ জুলাই উত্তরায় পৃথক আরেকটি সহিংসতায় টঙ্গী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ, নাঈমা সুলতানা, মো. ছাব্বির ইসলাম শাকিব ও মো. আসাদুল্লাহ নিহত এবং রাইসুল রহমান রাতুল গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনাতেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক একটি ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে।

উভয় মামলাতেই একই ব্যক্তিসহ মোট ২৬ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্দেশ প্রদান, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর দ্রুতই এসব মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ঘটনার বাকি অংশের তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই শেষে পৃথক ফরমাল চার্জ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।