ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের গৃহস্থালি যন্ত্র নির্মাতা ‘মিডিয়া’র বহনযোগ্য এসি ‘পোর্টাস্প্লিট’ এই গ্রীষ্মে ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত পণ্যগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
এ বছর পশ্চিম ইউরোপে রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাস পার হয়েছে। জার্মানির অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে।
মিডিয়া আগে ইউরোপে খুব পরিচিত ব্র্যান্ড ছিল না। তবে পোর্টাস্প্লিট বাজারে আসার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন দোকানে থাকা এসব যন্ত্র দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে। পরে অনেক ক্রেতা সেগুলো অনলাইনে পুনরায় বিক্রির জন্য তুলেছেন। সেখানে প্রায় ৭৫০ ইউরো দামের যন্ত্র দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি কোথায় এই এসি পাওয়া যাচ্ছে, তা জানাতে ‘মিডিয়াফাইন্ডার’ নামে একটি আলাদা ওয়েবসাইটও চালু হয়েছে।
ইউরোপের অনেক শহরে পুরোনো ও ঐতিহাসিক ভবনের বাইরের দেয়ালে ছিদ্র করে প্রচলিত এসির বাইরের ইউনিট বসানোর ওপর কঠোর নিয়ম রয়েছে। ফলে অনেক বাসিন্দা চাইলে সাধারণ এসি লাগাতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে পোর্টাস্প্লিট। এতে একটি হালকা বাইরের ইউনিট থাকে, যা ব্যবহারকারীরা সহজেই জানালার বাইরে বসাতে পারেন। এজন্য ভবনের দেয়ালে কোনো পরিবর্তন করতে হয় না। মিডিয়ার দাবি, এই যন্ত্র ইউরোপের অধিকাংশ ধরনের জানালার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার বাসিন্দা ডেনিস ইউরচাক বলেন, মিডিয়া এই সমস্যার খুব কার্যকর একটি সমাধান বের করেছে। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে তাপপ্রবাহের সময় এসি খুঁজতে গিয়ে প্রথম পোর্টাস্প্লিট সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে অনলাইনে ব্যবহারকারীদের ইতিবাচক মতামত দেখে তিনি এটি কেনেন। তার ভাষায়, এখন এই যন্ত্রকে ঘিরে এক ধরনের ব্যবহারকারী সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পর প্রতিদিনই অনেক মানুষ তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইছেন। তিনি বলেন, তাপপ্রবাহের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি দিন-রাত প্রায় সারাক্ষণ এসিটি চালিয়ে রেখেছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’কে মিডিয়া জানিয়েছে, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে তাদের এসি বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যদিও বিবিসির কাছে প্রতিষ্ঠানটির ইউরোপ কার্যালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেনি। শুধু মিডিয়াই নয়, চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান 'টিসিএল' জানিয়েছে, শুধু ফ্রান্সেই তাদের এসি বিক্রি ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় এসি নির্মাতা চীনের ‘গ্রি’ও বলেছে, এ গ্রীষ্মে তাদের পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তাদের অনেক ক্রেতাই জীবনে প্রথমবারের মতো এসি কিনছেন। কারণ ইউরোপে এখন আগের তুলনায় তাপপ্রবাহ আরো ঘন ঘন হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হচ্ছে।
তবে এসির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগও বাড়ছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় সাত শতাংশ খরচ হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি ও শিল্প খাত থেকে নির্গত মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ২ দশমিক ৭ শতাংশের জন্যও এসব যন্ত্র দায়ী। এ কারণে ইউরোপের পরিবেশবাদী এবং অনেক রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরেই এসির অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের মতে, এসি ভবনের ভেতর ঠাণ্ডা করলেও বাইরে গরম বাতাস ছেড়ে দেয়। ফলে জনবহুল এলাকায় বাইরের তাপমাত্রা আরো বাড়তে পারে। আবার অনেকের মতে, বছরে মাত্র কয়েক দিনের গরমের জন্য এসি কেনা অর্থের অপচয়। তবে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের পর অনেক মানুষের এই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। জুনের শেষ দিকে ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিনের রেকর্ড হয়। তীব্র গরমের কারণে সে সময় শত শত স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। এর কয়েক দিন পর দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানায়, স্কুল ও কমিউনিটি কেন্দ্রগুলোতে পাখা, এসি এবং অন্যান্য শীতলীকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে তারা ৮ কোটি ইউরো ব্যয় করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইউরোপ কার্যালয় বলেছে, এসি ব্যবহার করতে হবে পরিস্থিতি বুঝে এবং ভারসাম্য রেখে। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি তাপপ্রবাহ মোকাবেলার টেকসই সমাধান নয়। তবে চরম গরমে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সুরক্ষায় এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের সংবাদমাধ্যমগুলো পোর্টাস্প্লিটের জনপ্রিয়তাকে ‘চীনে তৈরি’ পণ্যের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। এত দিন ইউরোপে চীনা পণ্যকে তুলনামূলক কম মানের ও সস্তা বলে মনে করা হতো। তবে অনেক ব্যবহারকারী বলছেন, পোর্টাস্প্লিট ব্যবহারের পর তাদের সেই ধারণা বদলেছে। জার্মানির স্টিভেন শোলটিসেক বলেন, যন্ত্রটির নকশা ও মান তাকে ইতিবাচকভাবে অবাক করেছে। তার মতে, এটি ইউরোপের অন্যান্য ব্র্যান্ডের পণ্যের মতোই ভালো। ২০২৪ সালে জার্মানির বাজারে আসে পোর্টাস্প্লিট। মিডিয়ার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি স্টুটগার্টে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণাকেন্দ্রের জার্মান প্রকৌশল এবং ইতালীয় নকশার সমন্বয়ে তৈরি। শোলটিসেকের মতে, ড্রোন নির্মাতা ডিজেআই এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মতো চীনের প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। তিনি শুধু পোর্টাস্প্লিট কেনেননি, পরে মিডিয়ার শেয়ারও কিনেছেন। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী।
মিডিয়ার ইউরোপ কার্যক্রমের মহাব্যবস্থাপক রালফ কোবসিক বলেন, ইউরোপের বাজারে দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউরোপের ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। ফ্রান্সের ২৬ বছর বয়সী আদ্রিয়েন ওলার সম্প্রতি জীবনের প্রথম এসি হিসেবে একটি পোর্টাস্প্লিট কিনেছেন। তিনি বলেন, এসি কেনার আগে তীব্র গরমে ঠাণ্ডা থাকার জন্য বারবার মুখে পানি ছিটিয়ে সময় কাটাতে হতো। এখন ঘরে ঢুকলেই মনে হয় যেন ফ্রিজের ভেতরে ঢুকেছেন। তার ভাষায়, আগের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য সত্যিই অনেক বড়।


