দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার সুযোগ ফিরে পেলেন কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্যারিসের আপিল আদালত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ অপব্যবহারের মামলায় তার দণ্ড বহাল রাখলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর আরোপিত অযোগ্যতার মেয়াদ কমিয়ে দিয়েছেন।
তবে আদালতের রায় লে পেনের জন্য পুরোপুরি স্বস্তির নয়। অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে তার দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। তাকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক বছরের ইলেকট্রনিক নজরদারির শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপিল আদালতের এই সিদ্ধান্ত মেরিন লে পেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আবারও ফ্রান্সের ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এর আগে নিম্ন আদালতের রায়ে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, যার কারণে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। নতুন রায়ে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
মেরিন লে পেন ও তার দল ন্যাশনাল র্যালির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ দলীয় কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থে নিয়োজিত কিছু সংসদীয় সহকারী প্রকৃতপক্ষে ফ্রান্সে দলের সাংগঠনিক কাজে যুক্ত ছিলেন। এই মামলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
লে পেন শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য এই মামলা করা হয়েছে।
আদালতের এই সিদ্ধান্ত ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ, মেরিন লে পেন শুধু একটি দলের প্রধান নন, গত এক দশকে তিনি দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতাদের একজন হয়ে উঠেছেন। ২০১৭ ও ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তিনি দ্বিতীয় দফার ভোটে পৌঁছেছিলেন। দুইবারই বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে পরাজিত হলেও তার ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সাংবিধানিক কারণেই আগামী ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ম্যাক্রোঁ অংশ নিতে পারবেন না। ফলে নতুন নেতৃত্বের লড়াইয়ে মেরিন লে পেন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে থাকবেন। তার দল ন্যাশনাল র্যালি বর্তমানে ফ্রান্সের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লে পেনের রাজনৈতিক উত্থানের মূল ভিত্তি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। তার দল দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
সমর্থকদের মতে, তিনি সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা রাজনীতির কেন্দ্রে এনেছেন। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, তার রাজনীতি ফরাসি সমাজে বিভাজন বাড়াচ্ছে।
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যও এই রাজনৈতিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ন্যাশনাল র্যালি ক্ষমতায় এলে অভিবাসন আইন, নাগরিকত্ব, বিদেশিদের অধিকার এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে ঘিরে নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মেরিন লে পেনের মামলা এখন ফ্রান্সে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে, জনপ্রিয় কোনো রাজনীতিক আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পরও কি জনগণের ভোটে দেশের সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার সুযোগ পাবেন?
লে পেনের সমর্থকরা বলছেন, শেষ সিদ্ধান্ত জনগণের।
অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করছেন, দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত একজন নেত্রীর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফরাসি রাজনীতিতে নতুন নৈতিক সংকট তৈরি করেছে।


