মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। প্রধান বিচারপতির এক বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যায় ক্ষমতাসীন বিজেপিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে হাস্যরসের ভাষায় তুলে ধরা সিজেপি এখন নরেন্দ্র মোদির সরকার ও বিজেপির জন্য নতুন চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিজেপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। সংখ্যার দিক থেকে বিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টকে ছাড়িয়ে যায়।
সিজেপির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দেখতে গেলে অনেক ব্যবহারকারী একটি বার্তা দেখতে পাচ্ছেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘একটি আইনি সমস্যার কারণে’ অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, শশী থারুররাও ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ হয়ে মুখ খুলেছেন। এক্স-এ কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করে লেখেন, ‘দেশের সরকার যুবসমাজকে এতটাই ভয় পায় যে, একটি অনলাইন আন্দোলনকেও সহ্য করতে পারছে না।’
তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য, মহুয়া মৈত্র নিজেও ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) একজন ফলোয়ার। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের আরেক নেতা শশী পাঁজা।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রের নির্দেশেই সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আইবির দাবি, এই অ্যাকাউন্টটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্যভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের দাবি, তাদের পক্ষ থেকে কোনো উসকানিমূলক বা বেআইনি পোস্ট করা হয়নি, বরং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়েই পোস্ট করা হচ্ছিল।
তার প্রশ্ন, যদি কোনো ভুল বা অবৈধ কার্যকলাপ না থাকে, তাহলে কেন এই অ্যাকাউন্টের কার্যক্রম বন্ধ করা হলো। তবে এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
সিজেপির দ্রুত জনপ্রিয়তা এবং অল্প সময়ে বিপুল অনুসারী অর্জন অনেককেই বিস্মিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, এই অনলাইন আন্দোলন ভারতের বাস্তব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সামাজিক মাধ্যমে সিজেপি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তবুও বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের মতো বড় দলগুলো এখনও দেশজুড়ে লাখো সক্রিয় সদস্য নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে। তবুও সিজেপির জনপ্রিয়তা ও অনলাইন প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ যাত্রা
সাধারণত একগুঁয়ে, অপছন্দনীয় কিন্তু সহজে ধ্বংস না হওয়া প্রাণী হিসেবে পরিচিত তেলাপোকা থেকে অনুপ্রাণিত ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। মাত্র পাঁচ দিনেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যায় পেছনে ফেলে দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
বিতর্কের শুরু হয় গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। জাল ডিগ্রি ও বেকারত্ব প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি কিছু যুবককে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। এর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনা শুরু হয়। অনেক তরুণ ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয়ে একত্রিত হতে থাকেন, আর সেখান থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এই অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের জন্ম হয়।
সিজেপি কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন আন্দোলন। এর মজার সদস্যপদ শর্তের মধ্যে রয়েছে, বেকার হওয়া, অলস হওয়া, সব সময় অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারা।
এই ধারণার উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপক রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার ভাষায়, পুরো বিষয়টি প্রথমে শুধুই একটি রসিকতা হিসেবে শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি ভারতের আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এএপি একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল, যা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতির জন্য পরিচিত।
তিনি বিবিসি মারাঠিকে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমাদের সবার একত্রিত হওয়া উচিত, হয়তো শুধু একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যায়।’ এরপর যা ঘটল তা তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বড় ঘটনা। কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপি একটি গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করে, #MainBhiCockroach (আমিও একটি তেলাপোকা) হ্যাশট্যাগের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বিরোধী নেতাদের সমর্থন লাভ করে। গত বুধবার শীর্ষ বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব এক্স-এ পোস্ট করে লিখেন, ‘বিজেপি বনাম সিজেপি।’
এই আলোচনা অফলাইনেও ছড়িয়ে পড়ে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা তেলাপোকার বেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে হাজির হয়। এটি ছিল এই তকমাটিকে নাটকীয়ভাবে গ্রহণ করার একটি চেস্টা।
সিজেপির সমর্থকদের মতে, এটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে ‘তাজা বাতাসের ঝলক’, যেখানে অনেকেই মনে করেন মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত এবং ভিন্নমতকে সহজে গ্রহণ করা হয় না। এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন বিরোধী রাজনীতিক মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদ, পাশাপাশি প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও।
তবে সমালোচকদের দাবি, সিজেপি মূলত বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অনলাইন প্রচারণা। তারা এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, এটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চেয়ে বেশি পরিকল্পিত ডিজিটাল রাজনৈতিক উদ্যোগ।
তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে, সিজেপি অনেক তরুণ ভারতীয়ের হতাশা ও অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, তারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে রাজনীতি দেখলেও নিজেদের মতামত বা স্বার্থের যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পান না। ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও, তরুণদের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, ২৯ শতাংশ তরুণ কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না এবং মাত্র ১১ শতাংশ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ভাষায়, ‘অনেক মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করেন তাদের কথা শোনা হচ্ছে না এবং তাদের যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্বও করা হচ্ছে না।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই অসন্তোষ শুধু ভারতে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে তরুণদের নেতৃত্বে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনের পথও তৈরি করেছে। এসব আন্দোলনের পেছনে প্রধান কারণ ছিল কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
ভারত এখনো শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়নি। তবে যেসব কারণে সেখানে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলোই ভারতে বিদ্যমান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও কর্মসংস্থান, আয়-বৈষম্য এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। অনেক তরুণের কাছে উচ্চশিক্ষা আর নিশ্চিত চাকরি বা স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্নও আগের তুলনায় অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অবশ্য নেপাল বা শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে ভারতের তুলনা করতে রাজি নন। তার মতে, ভারতের পরিস্থিতি আলাদা। তবে তিনি স্বীকার করেন যে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাস্তব এবং সেটি এখন মূলত সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
দীপকে বলেন, ‘জেনারেশন জেড বা জেন জি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়।’
সিজেপির ওয়েবসাইটও তাদের ভিন্নধর্মী চিন্তার পরিচয় দিয়েছে। এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের মতো নয়, বরং মিম, ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও হাস্যরসের মিশ্রণে তৈরি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। নিজেদের তারা ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ বলে পরিচয় দেয় এবং এমন মানুষদের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়, যারা সবকিছু স্বাভাবিক বলে দেখানোর সংস্কৃতিতে বিরক্ত।
ওয়েবসাইটটির নকশা ও ভাষাও ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যঙ্গাত্মক ও অনানুষ্ঠানিক। কার্টুনধর্মী ছবি, অগোছালো ডিজাইন এবং মজার ভাষার কারণে এটি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে বন্ধুদের মধ্যে চলা একটি রসিকতার মতো মনে হয়। তবে হাস্যরসের আড়ালে সিজেপির কিছু রাজনৈতিক দাবিও রয়েছে। তারা জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমে সংস্কার, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলছে। পাশাপাশি বেকারত্ব, সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো এবং রাজনৈতিক ক্লান্তি নিয়েও আত্মবিদ্রূপমূলক মন্তব্য করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যঙ্গ ও বাস্তবতার এই মিশ্রণই সিজেপির জনপ্রিয়তার মূল কারণ। কারণ এর পেছনে রয়েছে চাকরির সংকট, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন। অনেকের মতে, তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কোনো বীরত্বের প্রতীক নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকা, মানিয়ে নেওয়া এবং সহজে হার না মানার প্রতীক।
রাজনীতি ও হাস্যরসের এই মিশ্রণ অবশ্য নতুন নয়। ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিবিদরা জনদৃষ্টি আকর্ষণে নানা নাটকীয় কৌশল ব্যবহার করে আসছেন। একইভাবে সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণাও এখন ভাইরাল ভিডিও ও আকর্ষণীয় স্লোগানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে তেলাপোকাকে প্রতীক করে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন রাজনৈতিক আন্দোলনের জনপ্রিয় হওয়া খুব একটা বিস্ময়কর নয়।


